তমালিকা দে, শিলিগুড়ি : বস্তি এলাকার ভেতরে রয়েছে দক্ষিণ শান্তিনগর হিন্দি প্রাথমিক স্কুল। এলাকার সিংহভাগ পড়ুয়াই প্রথম প্রজন্মের বা ‘ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার’। তাই পড়াশোনার জন্য স্কুলই তাদের একমাত্র ভরসা। পুজোর পর স্কুল খুললেই বার্ষিক পরীক্ষা। দীর্ঘ ছুটিতে এই পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের পড়াশোনার ঘাটতি মেটাতে এক আবেগঘন ও অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক চিত্তরঞ্জন সরকার। প্রতিদিন স্কুলের বারান্দাতেই তিনি নিচ্ছেন বিশেষ ক্লাস। তাঁর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ক্লাসে যোগ দিচ্ছে অন্য স্কুলের পড়ুয়ারাও। প্রধান শিক্ষকের এমন সদর্থক পদক্ষেপে রীতিমতো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন দুশ্চিন্তায় থাকা অভিভাবকরা।
নিয়মিত চর্চার অভাবে ছোটদের পড়া ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। পুজোর জন্য এক মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে প্রাথমিক স্কুল। বাড়িতে অভিভাবকরাও সেভাবে পড়াশোনা করাতে পারেন না। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার সেই বড় ঘাটতি মেটাতেই এই উদ্যোগ বলে জানান প্রধান শিক্ষক চিত্তরঞ্জন সরকার। তিনি বলেন, ‘স্কুল খুললেই বার্ষিক পরীক্ষা। এতদিন পড়াশোনা থেকে বিরত থাকলে ভুলে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তাই অঙ্ক, ইংরেজির উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।’ দশমীর পরের দিন থেকেই সপ্তাহে ছয়দিন সকাল এগারোটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত স্কুলের খোলা বারান্দায় এই ভালোবাসার পাঠশালা চালাচ্ছেন তিনি। নিজের স্কুলের পাশাপাশি পাশের হিিন্দ জুনিয়ার হাইস্কুলের পড়ুয়ারাও হাসিমুখে আসছে সেখানে। তাদের সুবিধার জন্য তিনি নিজে প্রশ্নপত্র বানিয়ে, ফোটোকপি করে পড়ুয়াদের হাতে তুলে দিয়ে ক্লাস করাচ্ছেন।
স্কুলের ছুটিতেও স্যরের ক্লাসে উপস্থিত চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া শিবম ঠাকুর জানায়, তার এখন বৃত্তি পরীক্ষা চলছে। স্কুলের বাইরে সে কোথাও টিউশন পড়ে না। তাই বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে এই ক্লাসে চলে আসে। শুধু পড়াশোনাই নয়, খুদে পড়ুয়াদের জন্য টিফিনেরও ব্যবস্থা করেছেন চিত্তরঞ্জনবাবু। কোনওদিন কেক ও বিস্কুট, আবার কোনওদিন মিষ্টি বা পাউরুটি তুলে দেন তিনি। বুধবার স্কুলে গিয়ে দেখা গেল, পড়াশোনা শেষে তৃপ্তির সঙ্গে কলা ও পাউরুটি খাচ্ছে কচিকাঁচারা। কেন এই আয়োজন? স্নেহমাখা মুখে চিত্তরঞ্জন হেসে বলেন, ‘অনেকেই স্কুলের মিড-ডে মিলের উপর নির্ভরশীল। এখন স্কুল বন্ধ থাকায় সেই সুযোগ নেই। তাই পড়ুয়াদের জন্য টিফিনের ব্যবস্থা করা।’
পঞ্চম শ্রেণির সন্ধ্যা গুপ্তা বলতে থাকে, ‘অঙ্ক একটু কঠিন লাগে কিন্তু স্যর এত সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন যে সেই সমস্যা অনেকটা মিটেছে।’ পাশের হিিন্দ জুনিয়ার হাইস্কুল থেকে পড়তে আসা ষষ্ঠ শ্রেণির সংগীতা কুমারী যাদব জানায়, পঞ্চম শ্রেণিতে তার পছন্দ মতো স্কুলে ভর্তি হতে পারার সুযোগ পায়নি সে। তাই অষ্টম শ্রেণিতে সেই কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য এখন থেকেই জোরকদমে পড়াশোনা শুরু করেছে। স্কুল বন্ধ থাকলেও এই ক্লাসে এসে অনেকটাই উপকার হয়েছে তার। প্রধান শিক্ষকের উদ্যোগে আপ্লুত স্থানীয় অভিভাবকরাও। ছেলেকে নিতে এসে শকুনি দেবী নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘কী পড়াতে হবে সেব্যাপারে আমরা বুঝি না। তাই মাস্টারমশাই বিনা পয়সায় এরকম উদ্যোগ নেওয়ায় আমাদের চিন্তা দূর হয়েছে।’ স্কুল বন্ধ থাকলেও বস্তি এলাকার খুদে পড়ুয়াদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই এক বটবৃক্ষ হয়ে উঠেছেন এই দরদি প্রধান শিক্ষক।

