Siliguri | চিনির রসে মাছির সাঁতার, রান্নাঘরে আরশোলার সংসার! শিলিগুড়ির ভোজনবিলাসের আড়ালে বড়সড়ো স্বাস্থ্যঝুঁকি

Siliguri | চিনির রসে মাছির সাঁতার, রান্নাঘরে আরশোলার সংসার! শিলিগুড়ির ভোজনবিলাসের আড়ালে বড়সড়ো স্বাস্থ্যঝুঁকি

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


খাবারের ব্যবসা যেন কুটিরশিল্পে পরিণত হয়েছে শিলিগুড়িতে। প্রায়দিনই নতুন নতুন ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুডের দোকান খুলছে। উপেক্ষিত থাকছে স্বাস্থ্যবিধি। সৌজন্যে প্রশাসনের উদাসীনতা আর খাদ্যপ্রেমীদের সব দেখেও না দেখার অভ্যেস। আজ প্রথম কিস্তি 

রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: শহর শিলিগুড়ি (Siliguri) খাদ্যপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্যই বটে। কী না মেলে এখানে! সকালবেলায় নান-তরকা, ক্লাব কচুরি দিয়ে শুরু। দিনভর হোটেল, রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুডের দোকানে ঠাসা ভিড়। বাঙালি, চাইনিজ থেকে মোগলাই খানা। দক্ষিণ ভারতীয় খাবারেরও তুঙ্গে জনপ্রিয়তা। সন্ধ্যা নামতেই আলো জ্বলে ক্যাফেগুলোতে। ফুড ভ্লগারদের পেজ খুললেই বোঝা যায়, খাবারের ব্যবসা যেন কুটিরশিল্পে পরিণত হয়েছে। প্রায়দিনই নতুন নতুন দোকান খুলছে। এই ঝাঁ চকচকে দুনিয়ার আড়ালে রয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি। স্বাস্থ্যবিধি (Meals Security)।

এই নিয়ে এর আগেও শতকথা হয়েছে। লেখালেখি হয়েছে। অভিযান হয়েছে। তবে, অভ্যেসটা বদলায়নি শহরের। পাশের পাড়ার দোকানের ফ্রিজ থেকে ছত্রাক পড়া মাশরুম কিংবা বিরিয়ানি থেকে পোকাধরা মাংস মিললেও আমার হুঁশ ফিরবে না মশাই। চুলোয় যাক হাসিমুখে বিশ্বাস করে খেতে আসা সেই ক্রেতার শরীর। লাভের গুড় আমার খাওয়া দিয়ে কথা। আচ্ছা, ওই ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও কি এভাবে রান্না হয়? অপরিচ্ছন্ন কিচেনে আরশোলা-ইঁদুরের ঠেকে রান্না হওয়া ভাত শান্তিতে মুখে তোলেন তাঁরা?

আজ-কাল করতে করতে এখনও শহরের একটা বড় অংশের খাদ্য ব্যবসায়ী সচেতন হতে পারেননি। অভিযোগ, তবুও হাত গুটিয়ে বসে প্রশাসন। আমআদমি সবকিছু দেখেশুনেও দিব্যি খাচ্ছেন, সেজন্য তাঁদের মাথাব্যথা কম। উদ্বিগ্ন শুধু কিছু সচেতন নাগরিক।

কথা হচ্ছিল হায়দরপাড়ার শ্রীমা সরণির বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক সুনন্দ দস্তিদারের সঙ্গে। তাঁর বক্তব্য, ‘অনেকদিন আগে দু-তিনদিন অভিযান হয়েছিল। এবার খবর বেরোলে হয়তো আবারও হবে। তারপর সবাই শীতঘুমে। কেউ বদলাবে না। বদলানোর সদিচ্ছা নেই। প্রশাসনের গা ঢিলেমির জন্য আরও সাহস পান ব্যবসায়ীরা।’

শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘোরার সময় চোখে পড়ল কিছু গা শিউরে ওঠা ছবি। অম্বিকানগর পার করে একটা ভাড়াবাড়ি। অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে দুটি বড় বড় চুলা জ্বলছে। দুটোর ওপর বসানো পেল্লাই আকারের হাঁড়ি। আশপাশে খোলা অবস্থায় কয়েকটি মশলার প্যাকেট রাখা। লবণের প্যাকেটের মুখটিও হাঁ করে রয়েছে। সবসময় খোলা থাকে, ফলে বাতাসের সংস্পর্শে এসে দলা পাকিয়ে গিয়েছে লবণ। মেঝেতে পোকামাকড়ের অবাধ বিচরণ। দমে বসানো হয়েছে বিরিয়ানি।

খুব বেশি কথা বলতে চাইছিলেন না কর্মীরা। অন্য ঘরগুলোতে ঢুকতে দিতে ইতস্তত বোধ করছিলেন। কোথায় যাবে এই বিরিয়ানি? আমতা আমতা করে একজন জানালেন, লেকটাউন, থানা মোড়, এনজেপি, তিনবাত্তি সংলগ্ন এলাকার একাধিক ছোট দোকানে এখান থেকেই রান্না করা বিরিয়ানি পৌঁছায়। হাঁড়ির আকার অনুযায়ী দাম নির্ধারিত হয়। তারপর সেই ব্যবসায়ী প্লেট হিসেবে বিক্রি করেন।

মিষ্টির দোকান, ফাস্ট ফুডের সেন্টারেও এক ছবি। দেশবন্ধুপাড়ার একটি মিষ্টির দোকানের হেঁশেলে উঁকি দিতে গিয়ে তো পা পিছলে পড়ার জোগাড়। মিষ্টি তৈরির জন্য যে ছানা কাটা হয়েছে, তার জল গড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। সবকিছুই আ-ঢাকা অবস্থায়। কোর্ট মোড় সংলগ্ন একটি মিষ্টির দোকানে খেতে বসলে সোজা আপনার চোখ যাবে রান্নাঘরের ভেতরে। তারপর আর কিছুই গলাধঃকরণ হবে না। সুভাষপল্লির একটি দোকানে রান্নাঘরে ঢুকলে চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হবে। দেওয়াল থেকে কড়াই, মেঝে থেকে খুন্তি- সবকিছুর ওপর তেলের প্রলেপ পড়েছে যেন। সেই দোকানেরই শোকেসে ইঁদুর ছুটতে দেখেছেন অনেকে।

শিলিগুড়ির মহাবীরস্থান থেকে থানা মোড়ের দিকে যাওয়ার রাস্তায় থাকা একাধিক দোকানেও এক দশা। কোথাও রাস্তার ধারে ভাজা হচ্ছে পরোটা, কোথাও কারিগর জিলিপির আড়াই প্যাঁচ দিচ্ছেন। তারপর চিনির রস থেকে তুলে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে পাশে। ধুলোবালি মেখে যেন স্বাদ বেড়ে যায়। রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ানোর অনুমতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেই। উঁকি দিয়ে যতটা নজরে এল, বড় বড় গামলায় রাখা মিষ্টি। চিনির রসে সাঁতার কাটছে মাছিরা।

স্টেশন ফিডার রোডে যে ফুড স্ট্রিট রয়েছে, সেখানকার অধিকাংশ দোকানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি হচ্ছে। খাবারের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ানো, পাউরুটির প্যাকেটের ভেতর বিশ্রাম নেওয়া কোনও কিছুতেই আরশোলাদের বাধা নেই।

সুপ্রিয়া ভাণ্ডারী মিলনপল্লির বাসিন্দা। একটি নার্সিংহোমের ব্যাক অফিসে কাজ করেন। বলছিলেন, ‘আমরা তো ভরসা করে বাইরে খাই। রান্নাঘরে কী চলছে, সেটা জানা বা বোঝা অসম্ভব। প্রশাসন কড়া না হলে অনিয়ম চলবেই।’ তাঁর পরামর্শ, শাস্তির নির্দশন তৈরি করতে হবে। মোটা জরিমানা। মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে, তাদের আইনি পথে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

প্রশাসন কী ভাবছে? পুরনিগমের স্বাস্থ্য বিভাগের মেয়র পারিষদ দুলাল দত্তর বক্তব্য, ‘নজরদারি চলছে, বন্ধ হয়নি। তবে এরজন্য একটা আলাদা কমিটি তৈরি হয়েছে। ওই কমিটি যেদিন আমাদের বলে, অভিযান হবে। সেদিন পাঁচটি বরো থেকে পাঁচজন ইনস্পেকটরকে পাঠানো হয়।’

অভিযানের পর কী হয়? অতীতে যে সমস্ত দোকানে বেনিয়ম ধরা পড়েছে, সেখানে থেকে সংগ্রহ করা নমুনা কোথায় গেল, তার খোঁজ করতেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *