শিলিগুড়ি: মাত্র ২২ কিলোমিটারের এক চিলতে ভূখণ্ড, অথচ সেটাই উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের একমাত্র লাইফলাইন। শিলিগুড়ি (Siliguri) করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ নামের এই স্পর্শকাতর অঞ্চলকে ঘিরেই এবার ভয়ংকর ভূ-রাজনৈতিক চক্রব্যূহ রচনা করছে বেজিং। নেপাল থেকে বাংলাদেশ— প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে আর্থিক অনুদানের টোপ দিয়ে ভারতের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে চিনা ড্রাগন। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, ভারতের এই সবচেয়ে দুর্বল অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুকেন্দ্রের ওপর মরণকামড় বসানো। কিন্তু দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর নয়া ভারতও শত্রুর চোখে চোখ রেখে যোগ্য জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
সামরিক মহলের চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের উত্তরাংশে চিনের বিপুল মদতে গড়ে ওঠা তিস্তা রিভার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট। এই তথাকথিত নদী উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালেই করিডর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ঘাঁটি গাড়ছে চিনা প্রযুক্তিবিদ এবং রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সংস্থার কর্মীরা। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর আসল উদ্দেশ্য হলো গভীর ছদ্মবেশে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক নজরদারি চালানো। ভারতীয় সেনার গতিবিধি, বাঙ্কারের অবস্থান এবং রসদ সরবরাহের খুঁটিনাটি ব্লু-প্রিন্ট হাতিয়ে নিতেই এই গুপ্তচরবৃত্তির জাল পাতা হয়েছে। বিপদের এখানেই শেষ নয়। করিডর থেকে মাত্র ১৩৫ কিলোমিটার দূরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে নতুন করে সাজিয়ে তুলছে চিন। ভারতের ইস্টার্ন এয়ার কমান্ডের ওপর নজরদারি চালাতে সেখানে চিনা সামরিক ড্রোন বা নজরদারি বিমান মোতায়েন করা হতে পারে। যুদ্ধের সময় আকাশপথে ভারতের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতেই এই নিখুঁত চাল চেলেছে শি জিনপিংয়ের দেশ।
পূর্বদিকের পাশাপাশি পশ্চিম প্রান্তেও সমানভাবে বিষদাঁত ফোটাচ্ছে বেজিং। নেপালের সীমান্ত ঘেঁষে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার দূরে ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি হচ্ছে ‘দামাক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, ভারত-নেপালের প্রায় অরক্ষিত সীমানাকে কাজে লাগিয়ে এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রটিকে কার্যত ভারত-বিরোধী হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা ছায়াযুদ্ধের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে চিনা গুপ্তচররা। এখান থেকেই উত্তরবঙ্গের বুকে অশান্তির আগুন জ্বালানোর ছক কষা হতে পারে।
প্রতিরক্ষা মহলের মতে, বেজিংয়ের এই আগ্রাসী রণনীতির আসল লক্ষ্য হলো, লাদাখ বা অরুণাচলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (LAC) সংঘাত বাধলে এই শিলিগুড়ি করিডরের টুঁটি চেপে ধরা। যাতে উত্তর-পূর্ব ভারতে সেনার অস্ত্র ও রসদ পৌঁছনোর পথ পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কিন্তু বেজিংয়ের এই আস্ফালন রুখতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে দিল্লি। করিডরের নিরাপত্তাকে নিশ্ছিদ্র করতে ইতিমধ্যেই আকাশপথে পাহারায় বসানো হয়েছে ঘাতক ‘এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ’ (S-400 Triumf) এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম। বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে সেনা ও আধুনিক সমরাস্ত্র। এছাড়া, যেকোনো পরিস্থিতিতে সেনার যাতায়াত সুরক্ষিত রাখতে মাটির তলা দিয়ে বিকল্প ও অভেদ্য রেললাইন বসানোর কাজও চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। ড্রাগন যদি ভারতের এই লাইফলাইনে থাবা বসানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে তার বিষদাঁত সমূলে উপড়ে ফেলতে যে ভারতীয় সেনা একপায়ে খাড়া, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

