বর্ধমান: স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরিতে দেশের মধ্যে সেরার স্বীকৃতি পাওয়ার কৃতিত্ব এতদিন ফলাও করে প্রচার করত রাজ্য সরকার। কিন্তু পালাবদলের পরেই সেই দাবির মূলে এক বিরাট ধাক্কা লাগল। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর ব্লকের একটি মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নামে থাকা কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন কুখ্যাত তৃণমূল নেতা তথা পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ মেহেমুদ খাঁন (Self assist group rip-off)। মঙ্গলবার বর্ধমানের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক বিভাস চট্টোপাধ্যায় ধৃতকে ৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘটনায় গোটা জেলার রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরেই ন্যায়বিচারের দাবিতে লড়াই চালাচ্ছিলেন ক্ষতিগ্রস্ত মহিলারা। কিন্তু তৎকালীন শাসকদলের প্রভাবে এতদিন কোনো আইনি পদক্ষেপ করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ। এরপর রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটতেই গত ২০ মে জামালপুর থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে এফআইআর দায়ের করেন ‘নারী চেতনা মাল্টিপারপাস মহিলা কো-অপারেটিভ সোসাইটি’-র দায়িত্বপ্রাপ্ত পদাধিকারী মীরাতাজ শেখ।
পুলিশকে দেওয়া অভিযোগে মীরাতাজ জানান, ২০২৩ সালে তিনি ওই সমবায় সমিতির দায়িত্বে থাকার সময় জানতে পারেন যে, তাঁদের সংস্থার নামে পশ্চিমবঙ্গ গ্রামীণ ব্যাঙ্কের জামালপুর শাখায় একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। কীভাবে এবং কার অনুমতিতে ওই অ্যাকাউন্ট খোলা হলো, তা নিয়ে তিনি বিডিও ও অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাছে জানতে চান। তখন তাঁকে জানানো হয় যে তৎকালীন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মেহেমুদ খাঁন এই বিষয়ে সব জানেন।
এরপর সমবায় প্রতিনিধি ব্যাংক গিয়ে দেখতে পান যে, তাঁর সই সম্পূর্ণ জালিয়াতি করে ওই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রায় আড়াই কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন করা হয়েছে। এই জালিয়াতির প্রতিবাদ করায় এবং তৎকালীন সভাপতি মেহেমুদ খাঁনের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ায় তাঁর লোকজন দিয়ে মীরাতাজকে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। শুধু স্বনির্ভর গোষ্ঠীর টাকাই নয়, একশো দিনের কাজের গাছের টাকা ও বাচ্চাদের স্কুলের পোশাকের টাকাও ব্যাপক পরিমাণে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন সরকারের আমলে কোনো প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে পালাবদলের পর তিনি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর অর্থ আত্মসাৎ ছাড়াও মেহেমুদ খাঁনের বিরুদ্ধে বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে তোলাবাজি সহ একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে। সেই সংক্রান্ত একটি মামলায় গত ৮ জুলাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। এরপর জেলহাজতে থাকা অবস্থায় পুলিশ আদালতের অনুমতি নিয়ে মেহেমুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং এই কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তার সরাসরি যুক্ত থাকার জোরালো প্রমাণ পায়।
এরপরই সরকারি টাকা তছরুপের এই নতুন মামলায় তাকে ‘শোন অ্যারেস্ট’ বা গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন জানায় পুলিশ। অর্থ উদ্ধার এবং এই চক্রের সঙ্গে আর কারা কারা জড়িত, তা বের করতে তদন্তকারী অফিসাররা ধৃতকে ৭ দিনের নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আর্জি জানান। উভয় পক্ষের সওয়াল শোনার পর বর্ধমানের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক বিভাস চট্টোপাধ্যায় ধৃত মেহেমুদ খাঁনকে ৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।

