ঠিক যেন উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা দৃশ্য। ভাঙা দেওয়াল, চিড় ধরা বারান্দা, আর একতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত পিলার জড়িয়ে থাকা বিশাল বট গাছ। ইতিহাস বলে, ‘দ্য ইন্ডিয়ান হোম মিশন টু দ্য সাঁওতালস’-এর মণ্ডল এবং পরবর্তীতে মিশন ও চার্চ গড়ে ওঠে এখানে। কিন্তু লোকমুখে অনেক গল্প ঘোরে এই বাড়ি নিয়ে। বেশিরভাগ গল্পই ভূতের। তবে নির্জন পরিবেশের জন্য দিনেরবেলাতেও এই বাড়ির সামনে দাঁড়ালে গা-টা ছমছম করে।
কল্লোল মজুমদার, মালদা: পুরাতন মালদা পুরসভার (Outdated Malda Municipality) শেষ প্রান্তে রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের নির্জন পরিবেশে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ভগ্নপ্রায় দোতলা বাড়ি। লোকমুখে এই বাড়িটি সাহেব দালান (Saheb Dalan Thriller) নামে পরিচিত। বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত এই বাড়ি নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য এবং লোককথা। কেউ বলেন, এই বাড়িটি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। অনেকে আবার একে ভূতুড়ে বাড়িও বলেন।
এই বাড়িটির সামনে দাঁড়ালে অদ্ভুত অনুভূতি হয়। ভাঙা দেওয়াল, চিড় ধরা বারান্দা, আর একতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত পিলার জড়িয়ে থাকা বিশাল বট গাছ। বট গাছের শিকড় আর ঝুরিগুলো দেখে মনে হয়, প্রকৃতিই যেন বাড়িটিকে ভেঙে পড়তে দিচ্ছে না। পুরোনো বাংলোটির ভিতে একটি পাথরে খোদাই করা আছে ‘লুথারিয়ান মিশন, ১৯৩৭’। যদিও সেই ফলক চোখে পড়া দায়। চারদিকে ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম, মাঝে মাঝে সাপের আনাগোনা, দূরে শিয়ালের চলাফেরা—সব মিলিয়ে মনে হয় এই জায়গাটি যেন কোনও রহস্য উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে।
কিন্তু এই সাহেব দালানের ইতিহাস কী? ইতিহাসের পাতা ওলটালে জানা যায়, ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে নরওয়ে থেকে লার্স ওলসেন স্ক্রিফসরুড এবং ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্ক থেকে হ্যান্স পিটার বোয়েরসেন ভারতে এসে সাঁওতাল পরগনায় খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তাঁরা আদিবাসী, বিশেষত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সামাজিক উন্নয়নের কাজে মন দেন। ইসি জনসনের সহযোগিতায় তাঁরা ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে ছোটনাগপুরের বেনাগরিয়ায় ‘দ্য ইন্ডিয়ান হোম মিশন টু দ্য সাঁওতালস’ নামে একটি মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। মালদা জেলার ইতিহাস গবেষক, নরহাট্টা জিএস হাইস্কুলের শিক্ষক দীপঙ্কর দাস বলেন, ‘পরবর্তীকালে এই মিশনের কার্যক্রম ছোটনাগপুর থেকে বাংলার সিউড়ি অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। এরপর ১৯৩৩-’৩৪ সালে রেভারেন্ড এইচপিএইচ ক্যাম্প খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে মালদা জেলার পুরাতন মালদা (Outdated Malda) ব্লকের রাঙ্গামাটিয়ায় প্রথম মণ্ডল প্রতিষ্ঠা করেন। এই মণ্ডল প্রতিষ্ঠায় তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন স্থানীয় বাঙালি সমাজের বলাই দত্ত, বসন্ত দত্ত এবং ঝাঁ পরিবারের সদস্যরা। পরবর্তীকালে এখানেই মিশন ও চার্চ গড়ে ওঠে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাঙ্গামাটিয়ার এই ভবনটি ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। যদিও এই এলাকায় মিশনের কার্যক্রম ১৯৩৭ সালের মধ্যেই সুসংগঠিত হয়, তবে ১৯৫০ সালের চার্চের পাদ্রি মহারাজ ভাণ্ডারীর প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে যে, বর্তমানে ‘সাহেব দালান’ নামে পরিচিত ভবনটি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দেই নির্মিত হয়।’
এই সাহেব দালান বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছেও বেশ জনপ্রিয়। রিলস বানাতে অনেকেই এখানে আসেন। তরুণ সুমন অধিকারী রবিবার সাহেব দালানে রিল বানাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ভগ্নপ্রায় সাহেব দালানের সৌন্দর্য আর নির্জন পরিবেশ ক্যামেরায় এক অন্যরকম আবহ তৈরি করে। সঙ্গে রয়েছে ইতিহাসের হাতছানি। আশা করছি রিলটা ভাইরাল হবে।’
পোড়োবাড়ি থাকবে আর ভূতের জল্পনা থাকবে না, তা কী করে হয়? স্থানীয় বাসিন্দা অপূর্ব ঘোষ বলেন, ‘এই বাড়িতে একসময় এক সাহেবের বাস ছিল। হঠাৎ এক অজানা ঘটনার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তারপর থেকেই নানা অলৌকিক কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে। ভূতের ভয়ে রাতে কেউ এখানে আসে না। রাতে এখানে কাউকে দেখতে পেলে আমরাই থাকতে বারণ করি। আসলে কখন কী হয়ে যায়…।’
এই গল্পগুলোর কোনও প্রমাণ নেই। আবার কেউ গল্পগুলো উড়িয়েও দিতে পারে না। শুধু ইতিহাসের গন্ধ মেখে, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল নিয়ে সাহেব দালান দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেকে রহস্য আর লোককথার ঘেরাটোপে মুড়ে।

