জলপাইগুড়ি ব্যুরো: নদীর ধারে বাস, ভাবনা বারো মাস। বারো মাসের ভাবনা তো বটেই, তবে বর্ষার মরশুমে ভাবনা রূপ নেয় ভয়ের। বৃষ্টিতে ফুলেফেঁপে ওঠে নদীর বুক। শান্ত স্বভাব ছেড়ে তাকে যেন পেয়ে বসে ধ্বংসের নেশা। সেরকমই গত কয়েকদিনের অঝোর ধারায় ফুঁসছে মূর্তি, নেওড়া, জলঢাকা এবং সুখানি নদী। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হয়েছে নদীভাঙন (River erosion)। এমনিতেই গত বছর অক্টোবরের ভয়াবহ প্লাবনের পর পাড় ভাঙতে ভাঙতে নদী অনেকটাই চওড়া হয়েছে। আরও কাছাকাছি চলে এসেছে লোকালয়ের। ফলে এবার বর্ষার গোড়াতেই বিপদের প্রহর গুনছেন ডুয়ার্সের (Dooars) নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা।
বিশেষ করে মূর্তি নদীর ধারাবাহিক পাড়ভাঙনে ভয়াবহ বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাড়ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সোমবার ১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন চালসা সংলগ্ন নাগরাকাটা ব্লকের পানঝোরার বাসিন্দারা। প্রায় ঘণ্টাখানেকের অবরোধে জাতীয় সড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। ভোগান্তির শিকার হন নিত্যযাত্রীরা। অবরোধের খবর পেয়ে চালসা-নাগরাকাটা ১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের মূর্তি সেতু সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছায় পুলিশ। প্রশাসনিক কর্তা ও বিজেপি নেতারাও ঘটনাস্থলে হাজির হন। প্রশাসনের তরফে মূর্তি নদীর ভাঙন রোধে কাজ শুরুর আশ্বাস দেওয়া হলে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেন। নদীর ভাঙন আটকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে একাধিকবার জানানো সত্ত্বেও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে অভিযোগ।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সূর্যকুমার ছেত্রী, দিকু লামারা জানাচ্ছেন, যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে এবং নদীর পাড় ভাঙছে তাতে প্রায় ৪০০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে পানঝোরা জনবসতি এলাকাটি নদী গিলে নিতে পারে। এদিন বিকেলে নাগরাকাটার বিডিও জয়প্রকাশ মণ্ডল সহ সেচ বিভাগের আধিকারিকরা মূর্তি নদীর ওই ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। নাগরাকাটা বিধানসভার বিধায়ক পুনা ভেংরা বলেন, ‘নদীভাঙন রোধে যাতে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানানো হয়েছে।’
বৃষ্টির জেরে মাটিয়ালি ব্লকে বিধাননগর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাটইগোল বস্তি এলাকার নেওড়া নদীতে দেখা দিয়েছে প্রবল ভাঙন। গত বছর অক্টোবর মাসের অতিবৃষ্টির ফলে ওই এলাকাটি আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। তখন সেচ বিভাগের তরফে অবশ্য ভাঙন রোধে পাথর এবং তারজালি দিয়ে কাজ করা হয়। তবে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ফের নতুন করে নদীর পাড়ভাঙন শুরু হয়েছে।
ভারী বৃষ্টিতে উত্তাল সুখানি নদী নাগরাকাটা চা বাগানে (Nagrakata Tea Backyard) রীতিমতো ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে। বাগানের প্রায় ১৫ একর চা আবাদি জমি জলমগ্ন। ৬ হেক্টর জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। রবিবার রাতের মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে সুখানি নদীর জলস্তর বেড়ে যায়। নদীর জল চা বাগানের বিভিন্ন অংশে ঢুকে পড়েছে। ম্যানেজার রাজেন্দ্র সিং জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাগানের সাউথ সুখনবাড়ি ডিভিশনে। পাড়ভাঙন ধীরে ধীরে চা বাগানের ফ্যাক্টরির দিকে এগোচ্ছে। ফ্যাক্টরির প্রাচীর ভেঙে পড়তে পারে। বাগানের দুটি শ্রমিক মহল্লাও ঝুঁকির মুখে। বাগান কর্তৃপক্ষ এবং শ্রমিকরা প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন।
একইরকমভাবে ময়নাগুড়ি ব্লকে রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতের জলঢাকা নদীর বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে কাশিয়ারবাড়ি, কামারঘাট এলাকার কিছু চা বাগানে জল প্রবেশ করে। পাহাড়ে আর সেভাবে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পরে অবশ্য জল নেমে যায়।

