শুভময় সান্যাল, শিলিগুড়ি : বিশ্বকাপে এক ডজন ছক্কা হাঁকিয়েছেন। যা মহিলাদের ওডিআই বিশ্বকাপে যুগ্ম সর্বোচ্চ। বিশ্বজয়ের সঙ্গে রেকর্ড গড়ার তৃপ্তি তো আছেই, এর বাইরে রিচা ঘোষ আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন ছক্কা হাঁকিয়ে। বলেছেন, ‘বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারি মারতে আমার ছোটবেলা থেকেই ভালো লাগে। খুব ছোট থেকে বাবার খেলা দেখতে দেখতে এটাই সবচেয়ে পছন্দের জিনিস হয়ে উঠেছিল। ভালো লাগছে, বিশ্বকাপের আসরে সেটাই করতে পেরে।’ শুধু নিজের ভালো লাগা নয়, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েরাও যাতে নিজেদের পছন্দকে বেছে নিতে পারে, সেই বার্তাই প্রথম বাঙালি হিসেবে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসে শিলিগুড়িবাসীর কাছে রিচা রেখেছেন।
১২টি ছক্কা
টিম ম্যানেজমেন্ট আমাকে চালিয়ে খেলার স্বাধীনতা দিয়েছিল। সেই মতো আমি নিজের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা চালিয়েছি। বরাবরই ছক্কা হাঁকাতে আমার খুব ভালো লাগে। আর সেটা দেশের কাজে লাগলে তার থেকে বেশি তৃপ্তি আর কিছুতে মেলে না।
বিশ্বকাপ জিতবেন, প্রথম উপলব্ধি
দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ হওয়ায় সবারই আমাদের নিয়ে প্রত্যাশা ছিল। তবে আমরা শুরু করেছিলাম ম্যাচ বাই ম্যাচ এগোনোর ভাবনা নিয়ে। ফাইনালেও আমরা ছোট ছোট টার্গেট সেট করে এগিয়েছি।
টানা তিন ম্যাচ হারের চাপ
বিশ্বকাপে এই সময়টা টিমের জন্য খুব কঠিন গিয়েছে। তবে ওই ম্যাচ তিনটিতেও বিপক্ষ আমাদের উড়িয়ে দিতে পারেনি। লড়াই করে সামান্য কিছু ভুলে ম্যাচ হাতছাড়া করেছি আমরা। তাই বিশ্বাস ছিল, নিজেদের নিখুঁত করে তুলতে পারলে আমরা কাপ জয়ের বড় দাবিদার হয়ে উঠব।
নিজের প্রতি আস্থা তৈরি
লিগ পর্যায়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৭৭ বলে ৯৪ রানের ইনিংসটার পর। ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে ওই ইনিংসটা আত্মবিশ্বাস অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ম্যাচটা জিততে পারলে আরও ভালো লাগত।
বিশ্বজয়ের জন্য কৃতজ্ঞতা
সতীর্থরা তো আছেই, কোচ থেকে শুরু করে টিমের সঙ্গে যুক্ত সকলেই এই সাফল্যের ভাগীদার। প্রাক্তনদের মধ্যে ঝুলনদি (গোস্বামী) সবসময় আমাদের প্রতি আস্থা দেখিয়েছেন। বারবার, তিনি বলতেন তোরা পারবি। আমাদের প্রতি তাঁর এই বিশ্বাস কঠিন সময়ে মনোবল জুগিয়েছে।
বিসিসিআইয়ের ভূমিকা
শুনেছি, একটা সময় মহিলা বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে দিন প্রতি ১ হাজার টাকা ভাতা পেত ক্রিকেটাররা। বিসিসিআই মহিলা ক্রিকেটের দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই ছবি অনেকটা বদলেছে। নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে ক্রিকেটাররা। মহিলাদের প্রিমিয়ার লিগ শুরু হয়েছে। যা সহজ করে দিয়েছে নতুন প্রতিভাদের উঠে আসার রাস্তা।
শিলিগুড়ির কারও কাছে কৃতজ্ঞতা
বাবা। ছোট থেকে এত দূর পৌঁছানোর নেপথ্যে বাবার পরিশ্রম, ভরসা।
ভাঙা আঙুলে সাফল্যের রহস্য
কোনও রহস্য নেই। লিগ পর্যায়ে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে একটা বল ধরতে গিয়ে আঙুলে চোট লাগে। এরপর বাংলাদেশ ম্যাচটায় উমা ছেত্রীকে খেলানো হয়। কিন্তু দলে সিনিয়ার উইকেটরক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্বটা জানতাম। তাই সেমিফাইনাল-ফাইনালে মাঠে নামা নিয়ে আমার কোনও দ্বিধা ছিল না। সবার আশীর্বাদে শেষ দুটো ধাপ পেরোতে পেরেছি।
পরবর্তী লক্ষ্য
আগামী বছরই টি২০ বিশ্বকাপ আছে। ভারত কখনও এই ট্রফিটা জেতেনি। সেই ট্রফির লক্ষ্যেই এবার পরিশ্রম করব।
বিশ্বজয়ের প্রভাব
(ভিড় দেখিয়ে) সকাল থেকে এত মানুষ আমাকে দেখার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন, তাঁরা নিশ্চয় এই বিশ্বকাপ জয় বিফলে যেতে দেবেন না। কপিল দেবের নেতৃত্বে (১৯৮৩ সালে) চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ক্রিকেট আমাদের চিন্তাধারা বদলে দিয়েছিল। আমি আশাবাদী এই জয়ে মহিলা ক্রিকেটও দেশের প্রতিটি কোনায় পৌঁছে যাবে।
পরবর্তী প্রজন্মের উদ্দেশে বার্তা
স্বপ্ন দেখো, পরিশ্রম করো। ফল কবে পাবে, সেই চিন্তায় উৎকণ্ঠায় ভুগো না। আমি বিশ্বাস করি, পরিশ্রমের ফল একদিন পাবেই।
