বিজেপির নতুন সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে পথ চলা শুরু করলেন নীতিন নবীন। বিহারের বাঁকিপুরের ৫ বারের বিধায়কের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন, নতুন সভাপতি তাঁরও বস। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে দেশ তথা বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের সভাপতি হওয়া নিঃসন্দেহে বড় কৃতিত্ব।
বিজেপির কয়েক মাসের সাংগঠনিক নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষে জগৎপ্রকাশ নাড্ডার উত্তরসূরি হিসাবে বিহারের অখ্যাত এক নেতার উত্তরণ শুনতে খানিকটা রূপকথার মতো। কিন্তু এটা ঘোর বাস্তব। বিজেপি হামেশা দাবি করে, তারা পরিবারতান্ত্রিক দল নয়। কংগ্রেস, তৃণমূল, সপা, আরজেডি, ডিএমকের মতো দলগুলির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যেভাবে একটি পরিবারের কুক্ষিগত, বিজেপির অবস্থা তেমন নয়।
বরং দলীয় কর্মী হিসেবে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর বিজেপি সভাপতি পদে বসার যোগ্যতা অর্জন হয় পদ্ম শিবিরে। বাম দলগুলির মতো বিজেপি ক্যাডারভিত্তিক দল। নীচু স্তর থেকে শীর্ষ স্তরে পৌঁছোতে তাই বামেদের মতো বিজেপিতে অগ্নিপরীক্ষায় পাশ করাটা দস্তুর। নীতিন নবীনের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়েছে কি না, সেটা অবশ্য জানা যায়নি।
তবে তিনি যে নাড্ডার পদে বসতে চলেছেন, সেটা মাসখানেক আগে কার্যনির্বাহী সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের সময় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। আরএসএস এবং মোদি-শা’র মধ্যে সভাপতি বাছাই নিয়ে দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধ চলেছে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মোদি-শা জুটি সংঘ পরিবারের প্রতিটি অ্যাজেন্ডাকে বাস্তব রূপ দিচ্ছেন।
কিন্তু তাঁদের বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠাটা আরএসএসের ঘোর অপছন্দ। আরএসএস চেয়েছিল, বিজেপির নতুন সভাপতি যেন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হন। কিন্তু মোদি-শা চেয়েছিলেন, নতুন সভাপতির যেন আরএসএসের পাশাপাশি তাঁদের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য থাকে। নীতিন নবীন দুই শিবিরেরই শর্ত পূরণ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, নীতিন মিলেনিয়াল প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাঁর মধ্যে তারুণ্যের শক্তি ও একইসঙ্গে সংগঠন চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। নীতিন অবশ্য বিলক্ষণ জানেন, আগামী দিনগুলি তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা ও দক্ষতার পরীক্ষা নেবে। সামনেই পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাডু, অসম, পুদুচেরির বিধানসভা ভোট। নতুন বিজেপি সভাপতির নেতৃত্বে দল ভোটযুদ্ধে নামবে।
তারপর ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশ এবং ২০২৯ সালে লোকসভা নির্বাচনেও নীতিনকে সাংগঠনিক অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। তিনি ভালোই জানেন, এই নির্বাচনগুলিতে বিজেপি সাফল্য পেলে জয়ধ্বনি উঠবে প্রধানমন্ত্রীর নামে। কিন্তু ব্যর্থ হলে দায় বর্তাবে দলীয় সভাপতির কাঁধেই। তিনি এর আগে বেশকিছু সাংগঠনিক দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছেন। সেই সাফল্য ফের যাচাই হবে ভোটের কষ্টিপাথরে।
১৯৮০ সালে বিজেপি তৈরি হওয়ার পর প্রথম সভাপতি হন অটলবিহারী বাজপেয়ী। তারপর লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলীমনোহর যোশি, বেঙ্কাইয়া নাইডু, রাজনাথ সিং, নীতিন গড়করি, অমিত শা’রা দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর পথ যে কাঁটায় ভর্তি, সেটা নবীনের অজানা নয়। যেটা জানা যাচ্ছে না, সেটা হল তাঁর কর্মপদ্ধতি এবং নেতা হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটা।
ভারতীয় রাজনীতিতে এখনকার রথী-মহারথীদের ঔজ্জ্বল্যের মাঝে নীতিন অনেকটাই ফিকে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি বিজেপিকে সাফল্যের মুখ দেখাতে সমর্থ হবেন কি না, সেটা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। কংগ্রেস যখন অশীতিপর মল্লিকার্জুন খাড়গেকে সামনে রেখে বিজেপি বিরোধী লড়াইকে তীব্র করার চেষ্টা করছে, তখন আনকোরা নবীনের হাতে নেতৃত্বের রাশ তুলে দিলেন মোদি-শা জুটি।
নবীন জানেন, দায়িত্বে ত্রুটি থাকার অর্থ বিজেপির দেশব্যাপী গেরুয়া সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে বড়সড়ো বাধা সৃষ্টি হওয়া। বিজেপি সফল হলে তবেই তাঁর সাফল্য। তিনি ভালোমতো জানেন, মুখে তাঁকে বস বলা হলেও বিজেপিতে এই মুহূর্তে প্রকৃত বস মোদি ও শা’ই। তাই শুধু প্রশ্নাতীত আনুগত্যের মাপকাঠিতে নয়, সফল কান্ডারি হতে নির্বাচনি সাফল্যকেই আপাতত পাখির চোখ করেছেন।
