বিবেকানন্দ সরকার, রায়গঞ্জ: পেশা তাঁর শিক্ষকতা, কিন্তু নেশায় ধান সংরক্ষণ। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে হেতুমারি, বহুরূপী, পারিজাত, রাধাতিলক, কেরালা সুন্দরী সহ অজস্র প্রজাতির ধান। বাংলার বাইরে তাঁর সংরক্ষণে রয়েছে অসম, মণিপুর, অরুণাচলপ্রদেশ, কেরল, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ সহ একাধিক রাজ্যের হারিয়ে যাওয়া ধান। পেশায় উচ্চমাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক চিন্ময় দাস শুধু হারিয়ে যাওয়া ধানগুলিকে নিজের সংরক্ষণে রাখেননি। নতুন করে ওই ধানের চাষ শুরু করার লক্ষ্যে তিনি জমিতে ফিরিয়ে দিয়েছেন ৬১৮টি দেশি ধানের বীজ। উত্তর ও দক্ষিণ, দুই দিনাজপুর মিলিয়ে এখন প্রায় দেড়শো কৃষক হারিয়ে যাওয়া ধান চাষ করছেন শিক্ষকের উদ্যোগে।
কবিরাজ শাল এক ধরনের দেশি ধান, যা এখন প্রায় লুপ্তপ্রায়। এই ধান আয়রন ও জিঙ্কের মতো খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ হওয়ায় রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত। হেতুমারি রেড রাইস সমৃদ্ধ ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে। কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যুক্ত ধানের মধ্যে রয়েছে কালো চাল, লাল চাল। প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ফাইবার, ভিটামিন বি ফাইভ থাকার কারণে চালগুলি ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য আদর্শ। কারণ, এই চাল রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। আলসারের সমস্যা থাকলেও ব্ল্যাক রাইস, ব্রাউন রাইসের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পুষ্টি ও নানান গুণ সমৃদ্ধ ধান হারিয়ে যেতে বসাতেই তা সংরক্ষণে জোর দেন শিক্ষক চিন্ময়। ২০১১ থেকে শুরু করেন লড়াই। প্রথম চার বছরে লুপ্তপ্রায় প্রায় ১৫০ জাতের ধান সংরক্ষণ করেন তিনি। এখন তাঁর সংগ্রহে ৬১৮টি প্রজাতির ধান। গড়ে উঠেছে ফিয়াম সিড ডাইভারসিটি কনজারভেশন সেন্টার।
চিন্ময় বলছেন, ‘আসলে আবেগকে বাস্তবে রূপায়ণ করার উদ্যোগ। ২০১১ সাল থেকে কাজ করছি। কাশ্মীর থেকে অরুণাচলপ্রদেশ, বাংলার বিভিন্ন ধান সংরক্ষিত রয়েছে ফিয়াম সিড ডাইভারসিটি কনজারভেশন সেন্টারে। বাজারে প্রাপ্ত পালিশ করা সাদা চালগুলি আসলে কার্বোহাইড্রেটের দলা, যাতে খাদ্যগুণ সেভাবে নেই। যে কারণে সুগার, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তাল্পতা সহ নানান রোগ বেড়েই চলছে।’ ধান সংরক্ষণে চিন্ময়ের সঙ্গে কাজ করছেন সুদীপ্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘দেশি ধানের জাতগুলিকে বাঁচিয়ে না রাখলে আমাদের বায়োডাইভারসিটি হেরিটেজ হারিয়ে যাবে। তাই শুধুমাত্র সংরক্ষণ নয়, আমরা জৈব কৃষি নিয়ে নিয়মিত গ্রামভিত্তিক প্রচার সভার আয়োজন করছি। কৃষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বীজ মেলার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ধানের জাতগুলিকে কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।’
ফিয়াম সিড ডাইভারসিটি কনজারভেশন সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত কৃষক মনমোহন দাস বলেন, ‘২০১১ সাল থেকে চিন্ময়বাবুদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। চার বিঘা জমিতে হেতুমারি, দুই বিঘা জমিতে বাসফুল চাষ করছি। পুরোটাই জৈব উপায়ে চাষ করছি। হেতুমারি রেড রাইস লুপ্ত হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু এই ধান চাষ করে নতুন করে লাভের মুখ দেখছি।’
