বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: আর পাঁচজন নবজাতকের মতো জন্মেছিল ওরাও। মায়েরা হাসপাতালে জন্ম দিয়েছেন দুইজনকে। তবে জন্মের পরই ওদের পরিচয়টা বদলে গিয়েছিল। ওদের জন্মদাত্রীরা মানসিক ভারসাম্যহীন। বাবার পরিচয় অজানা। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে কেটে গিয়েছে প্রায় তিন মাস। একরত্তি ছেলেমেয়ে দুটির আশ্রয় এখন রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের (Raiganj Authorities Medical Faculty & Hospital) গাইনি ওয়ার্ড। নিজেদের মায়েরা মানসিকভাবে অসুস্থ। তাই বলে শিশুদের যত্নে কোনও ত্রুটি হচ্ছে না। নার্স মায়েদের কোলেই বেড়ে উঠছে দুজন।
চলতি বছরের অগাস্ট মাসে এক মহিলা হাসপাতালের করিডরে পুত্রসন্তান প্রসব করেছিলেন। গত প্রায় চার বছর ধরে হাসপাতালের ক্যাম্পাসেই ঘুরে বেড়াতেন মানসিক ভারসাম্যহীন ওই মহিলা। আরেক হিন্দিভাষী মহিলাকে ইটাহার থানার দুর্গাপুরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকা থেকে নিয়ে এসেছিল এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। পরে একইদিনে দুজনে সন্তান প্রসব করেন। দ্বিতীয় মহিলা কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। তিনিও মানসিক ভারসাম্যহীন। বর্তমানে ওই দুই শিশুকে দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন হাসপাতালের নার্স ও আয়ারা। পালিতা মায়েরা কিনে দিচ্ছেন জামাকাপড়, ওষুধ খাওয়াচ্ছেন সময় মেপে। তবে ওরা কতদিন হাসপাতালে থাকবে? তাদের ভবিষ্যৎই বা কী হবে? প্রশ্ন রয়েছে, তবে উত্তর নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি সকলেই চুপ।
যদিও সদ্য ভেঙে যাওয়া জেলা চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারপার্সন দীপান্বিতা আগরওয়াল বলেন, ‘উত্তর দিনাজপুর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির বৈঠকে এবিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে সম্প্রতি কমিটি ভেঙে যাওয়ায় আমরা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।’
এদিকে জেলার শিশু সুরক্ষা আধিকারিক জানাচ্ছেন, নবজাতকেরা আপাতত হাসপাতালেই সুরক্ষিত রয়েছে। তবে বাইরে থেকে হাসপাতালে আনা মহিলার পরিচয় জানা যায়নি। অন্যদিকে, শেষ কয়েকবছর হাসপাতালে থাকা আরেক মহিলা কীভাবে গর্ভবতী হলেন সে সম্পর্কেও কেউ মুখ খোলেনি। জানা গিয়েছে, এর আগেও তিনি সন্তান প্রসব করেছেন। এব্যাপারে হাসপাতালে আগে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও কোনও লাভ হয়নি। এখন মানসিক ভারসাম্যহীন দুই মা হাসপাতালে যত্রতত্র ঘোরাফেরা করেন। শিশুদের বিষয়ে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের সুপার প্রিয়ঙ্কর রায় বললেন, ‘শিশুদের জন্য খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা হাসপাতাল থেকেই করা হয়েছে। নার্সরা ওদের জামাকাপড় কিনে দিয়েছেন। যাবতীয় দেখভাল তাঁরাই করছেন।’ অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স জানালেন, অন্য প্রসূতি মায়েদের দুধ সংগ্রহ করে শিশুদের খাওয়ানো হচ্ছে। তবে এভাবে কতদিন, জানে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও। এমন পরিস্থিতিতে জেলা শিশু সুরক্ষা দপ্তর শিশুদের স্পেশাল চাইল্ড কেয়ার ইউনিটে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কেন নিচ্ছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে ভবিষ্যৎ যাই হোক, বর্তমানে হাসপাতালে নার্স মায়েদের কোলে দিব্যি দিন কাটছে দুই শিশুর।
