বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: আদালতের কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রয়েছে প্রশাসনের নজরদারির আশ্বাসও। কিন্তু রায়গঞ্জ (Raiganj) শহরে সেসবকে থোড়াই কেয়ার করছে জমি মাফিয়ারা (Land Mafia)! প্রভাবশালীদের দাপটে রায়গঞ্জের মানচিত্র থেকে একে একে মুছে যাচ্ছে পুরোনো সব জলাশয়। কখনও দিনের আলোয় টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে, আবার কখনও রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে ট্রাকবোঝাই মাটি ফেলে চলছে এই প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের কারবার। সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই রায়গঞ্জ শহরের এফসিআই মোড় সংলগ্ন পুরোনো জাতীয় সড়কের ধারের একাধিক জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
শহরের প্রাণকেন্দ্র উকিলপাড়ার পীরপুকুরের বিশাল জলাশয়টি এখন আর চেনাই যায় না। সেখানে টিনের বেড়া দিয়ে গোপনে মাটি ফেলে তৈরি হয়েছে নার্সিংহোম। পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্রটা আরও করুণ। সেখানে জাতীয় সড়ক লাগোয়া যে বিশাল জলাশয়ে এক বছর আগেও পানিফলের চাষ হত, আজ তা ধু-ধু মাঠ। নতুন কারও পক্ষে দেখে বোঝাই মুশকিল যে একসময় এখানে জলাশয় ছিল। অশোকপল্লির প্রায় কুড়ি বিঘার জলাশয় বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন সেখানে প্লট করে জমি বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারি নথি বলছে, মোহনবাটী মৌজায় একসময় ১৮৪টি পুকুর ও ৫৪টি ডোবা ছিল। বরুয়া মৌজায় ছিল ১১২টি পুকুর ও ৪৭টি ডোবা। এছাড়া রায়গঞ্জ মৌজায় ছিল অন্তত ৯৬টি জলাশয়। আজ তার বেশিরভাগই ইতিহাস।
পরিবেশপ্রেমী সঞ্জিত গোস্বামী বলেন, ‘মানুষের ভালো থাকার সঙ্গে জলাভূমি সংরক্ষণ প্রক্রিয়াটি জড়িত। এটি মানুষের উপযোগী সুস্থিত পরিবেশের জন্য দরকার। এছাড়া জলাধারে বৃষ্টির জল ঢুকে ভূগর্ভের জল ভাণ্ডার মজবুত করে।’ লোকালয়ে জলাশয় কমলে আচমকা আগুন লাগলে তা নেভানো অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে জেলার পরিবেশপ্রেমীরা উদ্বিগ্ন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, চোখের সামনে পুকুর বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে দেখলেও প্রতিবাদের উপায় নেই। প্রতিবাদ করলে ‘একঘরে’ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এই অবৈধ কারবার নিয়ে বিএলএলআরও অফিসের অন্দরেও উঠছে নানা প্রশ্ন। দপ্তরের এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক জলাশয়ের ‘চরিত্র’ নথিতে অবৈধভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ বছরখানেক আগেও স্থানীয় মানুষ এসব পুকুরে স্নান করতেন। রায়গঞ্জ ব্লকের ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক সৌমেন চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের কাছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। রায়গঞ্জ থানার আইসি-কেও ফোন মারফত বিষয়টি দেখার জন্য বলা হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রতিদিন ব্লকজুড়ে আমাদের দপ্তরের তরফে অভিযান চলছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা করা হচ্ছে। বেআইনি ভরাটকারীরা এবার আর পার পাবে না।’ রায়গঞ্জ পুরসভার প্রশাসক সন্দীপ বিশ্বাসও কড়া পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘বেআইনি পুকুর ও জলাশয় ভরাট কোনওমতে বরদাস্ত করবে না রায়গঞ্জ পুরসভা।’
নথি অনুযায়ী রায়গঞ্জে সবমিলিয়ে ২৬২৭.২১ একর জলাভূমি থাকলেও বাস্তবে তা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ভরাট করার পর পুকুর মালিকদের দাবি, ওগুলো জলাশয় নয়, ছিল নীচু জমি। কিন্তু স্থানীয়দের স্মৃতি বলছে অন্য কথা। এখন প্রশ্ন হল, প্রশাসনের এই আশ্বাসে কি সত্যিই পুকুরগুলো রক্ষা পাবে, নাকি প্রভাবশালীদের গ্রাসে রায়গঞ্জের বাস্তুতন্ত্র অদূরভবিষ্যতে সংকটে পড়বে?
