রায়গঞ্জ: জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা ‘মাধ্যমিক’। একদিকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি, অন্যদিকে প্রিয়জনকে চিরতরে হারানোর বুকফাটা হাহাকার। সোমবার অঙ্ক পরীক্ষার সকালে এমনই এক মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদায়ক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল রায়গঞ্জের দানিগাছি গ্রাম। পরীক্ষার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মাকে হারিয়েও, পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাল নন্দিনী বর্মন। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে সেই হাতেই মায়ের মুখাগ্নি করল সে।
পরীক্ষার সকালেই সব শেষ
ভূপাল চন্দ্র বিদ্যাপীঠের ছাত্রী নন্দিনীর মা রেখা বর্মন (৪০) দীর্ঘ দিন ধরে ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। কয়েক দিন আগে অসুস্থতা বাড়লে তাঁকে রায়গঞ্জের একটি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়। রবিবার মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে এসেছিল নন্দিনী, ভেবেছিল মা সুস্থ হয়ে ফিরবেন। কিন্তু সোমবার ভোরেই সব শেষ হয়ে যায়। যখন বাড়িতে শোকের আবহ, তখন নন্দিনী স্থির করে মায়ের দেখা শেষ স্বপ্নটি সে পূরণ করবেই।
পরীক্ষাকেন্দ্রে তিন ঘণ্টার লড়াই
মায়ের নিথর দেহ তখন নার্সিংহোমে, বাবা শ্যামল বর্মন সেখানে একা। ছবিতে মায়ের পায়ে প্রণাম করে স্কুল ইউনিফর্ম পরে তৈরি হয় নন্দিনী। জেঠু পার্থ বর্মনের বাইকে চেপে সে পৌঁছায় দেবীনগর মাড়াইকুড়া ইন্দ্র মোহন বিদ্যাপীঠে। নন্দিনীর খবর পেয়ে আগেই স্কুলে পৌঁছে যান তাঁর বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পরীক্ষাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক বিশ্বজিৎ মণ্ডল জানান, নন্দিনীর জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা থাকলেও সে সবার সঙ্গেই পরীক্ষা দিয়েছে।
পরীক্ষা থেকে সরাসরি শ্মশানে
পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরতেই নন্দিনীর সামনে এসে পৌঁছায় মায়ের মরদেহ। কান্নায় ভেঙে পড়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিল সে। কিন্তু কর্তব্যে অবিচল নন্দিনী এরপর শ্মশান অভিমুখে রওনা দেয়। বিঘা পাঁচেক জমি আর চাষবাস করে চালানো অভাবের সংসারে মা-ই ছিল নন্দিনীর পৃথিবী। সেই গর্ভধারিণী জননীর মুখাগ্নি করে জীবনের কঠিনতম পাঠ নিল এই কিশোরী।
নন্দিনীর কান্নাভেজা উক্তি: “মা চেয়েছিলেন আমি যেন মাধ্যমিকে ভালো ফল করি, অনেক পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াই। মায়ের সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই আমি পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম।”
পাশে দাঁড়িয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ
নন্দিনীর স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক কাঞ্চীরাম রায় বলেন, “নন্দিনী অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ী। এই কঠিন সময়ে আমরা ওর পাশে আছি। আমরা চাই ও সবকটি পরীক্ষা দিক।” আগামীকালও পরীক্ষা রয়েছে, কিন্তু মা-হারা মেয়েটি শোক সামলে কীভাবে আবার কলম ধরবে, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন গ্রামবাসী ও পরিজনেরা।
