প্রসেনজিৎ সাহা, দিনহাটা: দিনহাটায় (Dinhata) এখন সবচেয়ে চর্চিত বিষয় হল পুরসভার ভুয়ো বিল্ডিং প্ল্যান (Pretend constructing plan rip-off) পাশ কাণ্ড। ২০২৪ সালে ১৫ জন বাসিন্দার পুরসভায় (Dinhata Municipality) অভিযোগের সূত্র ধরে ভুয়ো বিল্ডিং প্ল্যান পাশ কাণ্ড প্রথম প্রকাশ্যে আসে। পুরসভা সূত্রের খবর, খাতায়-কলমে ১৫টি অভিযোগ হলেও এই অভিযোগের তালিকা আরও লম্বা হবে। শুধু বাড়ি নয়, একাধিক দোকানের প্ল্যান পাশ করাত এই চক্রে জড়িতরা। অনেকেই ঝক্কি এড়াতে অভিযোগ না করে প্ল্যান করিয়ে নেয়। তবে প্রশ্ন উঠছে একের পর এক ভুয়ো প্ল্যান বাসিন্দাদের দেওয়া হলেও তা পুরসভার আধিকারিকদের কানে কেন পৌঁছায়নি। আর যখন পৌঁছেছে তখন দুর্নীতি এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
দিনহাটা পুরসভার তৃণমূল কাউন্সিলার জাকারিয়া হোসেনের কথায়, ‘এই কাণ্ডের সঙ্গে পুরসভার বোর্ড কোনওভাবেই জড়িত নয়। কেননা সেসময় পুরসভা চলত দিনহাটা শহরের কফি হাউস থেকে। তবে সেসময়ও পুরসভা পদক্ষেপ করেছিল বলে অভিযোগগুলি সামনে এসেছিল।’
বিধায়ক অজয় রায়ের কথা, ‘তৃণমূল পরিচালিত পুর বোর্ডের সময়কার এই দুর্নীতি নিয়ে যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁরাই এই অভিযোগ করেছিলেন। যাঁরা যাঁরা এই অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত তাঁদের সকলেরই বিচার হবে এবার।’
প্রশ্ন উঠছে এই ভুয়ো বিল্ডিং প্ল্যান বানানোর চক্র কাজ করত কীভাবে? অন্তর্তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে এই চক্রের একজনকে রেইকি করতে বলা হত। রেইকি চলাকালীন শিকার হাতের নাগালে চলে এলেই চলত ফাইনের হুমকি। আর ওই বাসিন্দা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে জানতে চাইতেন কী করতে হবে। তখনই এই চক্রের পান্ডারা টাকা হাতিয়ে নিয়ে বানিয়ে দিতেন ভুয়ো প্ল্যান। এখানেই শেষ নয়, এই চক্র যেমন বাইরে সক্রিয় ছিল, তেমনটাই ছিল পুরসভার ভেতরেও। এই চক্রের পান্ডারা ওঁত পেতে থাকতেন। যখনই কেউ বিভাগে প্ল্যান নিয়ে আসতেন তখনই তাঁরা ওই বাসিন্দার বাড়ি পৌঁছে যেতেন। এরপর কীভাবে কম টাকায় তঁার বিল্ডিং প্ল্যান হয়ে যাবে তার উপায় বাতলে দিতেন।
বিশেষ করে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই প্ল্যান পাশের কাজ অফলাইন করা বন্ধ হয়ে যায়। এরফলে যেসব বাসিন্দা অনলাইনে প্ল্যান পাশ করাতে আসতেন তাঁদের টাকার পরিমাণ সেক্ষেত্রে অনেকটাই বেশি হত। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাতেন চক্রের পান্ডারা। তঁারা ওই বাসিন্দাকে ব্যাকডেট দিয়ে অফলাইনে প্ল্যান বানিয়ে দেবার আশ্বাস দিতেন। বাসিন্দারাও কম খরচের মোহে পড়ে তাঁদের কথায় রাজি হয়ে যেতেন। আর এরপর ওই চক্রের পান্ডারা জাল প্ল্যান বানিয়ে বাসিন্দাদের দিয়ে দিতেন। তবে প্রশ্ন উঠছে জাল প্ল্যান বানালেও কেন প্রশ্ন জাগেনি বাসিন্দাদের মনে?
অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, যে প্ল্যান দেওয়া হত সেখানে চেয়ারম্যান, এগজিকিউটিভ অফিসার ও পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারের সই থাকত। পাশাপাশি তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার রসিদও দেওয়া হত। যদিও সেই রসিদও জাল বানানো হত, পুরসভার বিল প্যাটার্ন থেকে সেটা ছিল একেবারে আলাদা। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তা বোঝার কোনও উপায় ছিল না। তবে প্রশ্ন উঠছে সেখানে থাকা সইগুলো জাল না আসল? বর্তমান তদন্তকারীরা সেবিষয়ে খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছেন।
এদিন ভুক্তভোগী বাসিন্দা গৌতম সাহা বলেন, ‘আমার বাড়ির ওপরতলার কাজ করছিলাম। হঠাৎ একদিন পুরকর্মী উত্তম চক্রবর্তী এসে বলেন পুরসভা থেকে তাঁকে উপরতলা করার অনুমতি আছে কি না তা দেখতে পাঠানো হয়েছে। তা না থাকার কথা বলতেই তিনি জানান, তাহলে তো ফাইন দিতে হবে। এরপর তৎকালীন চেয়ারম্যান গৌরীশংকর মাহেশ্বরীর কাছে গেলে তিনি উত্তমের সঙ্গে বিষয়টি মিটিয়ে নিতে বলেন।’ তিনি বলেন, ‘সেসময় ৫০ হাজার টাকায় আমাকে প্ল্যান বানিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পুরসভায় গিয়ে জানতে পারি এই বিল্ডিং প্ল্যান জাল। এবার পুলিশ যেভাবে তদন্ত শুরু করেছে আশা করব এর মাথা কে, তাকে খুঁজে বের করবে।’
