বিশ্বজিৎ প্রামাণিক, পতিরাম: পঞ্জিকার পাতায় ৭ ফাল্গুন মানেই পতিরামের খাঁপুর গ্রামে শহীদ তর্পণের ভিড়! ১৯৪৭-এর সেই ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের ২২ জন (মতভেদে ২৫ জন) শহীদের স্মরণে মঞ্চ তৈরি হয়, মাল্যদান চলে, চলে রাজনৈতিক ভাষণ। একসময় বামেদের একচেটিয়া এই দুর্গ এখন তৃণমূল ও বিজেপিরও শক্তিবৃদ্ধির ক্ষেত্র। কিন্তু উৎসবের আলোকবৃত্তের বাইরে রয়ে গেছেন সেইসব মানুষেরা, যাঁদের পূর্বপুরুষেরা ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ আদায়ের দাবিতে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন।
সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত ‘শহীদ পরিবার’
শহীদ কৌশল্যা কামারনির নাতি রতণ কোল আজ একজন সাধারণ দিনমজুর। আরেক নাতি হীরা কোলের পরিবারের সদস্যা মমতা কোলের অভিযোগ, তাঁদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ৩৫ বছর বয়স হলেও জোটেনি ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, নেই স্বাস্থ্যসাথী কার্ড বা কাস্ট সার্টিফিকেট। একটি ভাঙাচোরা ত্রিপল ঘেরা ঘরে তাঁদের বসবাস। সরকারি আবাস যোজনার ঘরও তাঁদের কপালে জোটেনি।
একই অবস্থা শহীদ ভোলানাথ কোলকামারের বোন চাপিয়া কোলের। শারীরিক অসুস্থতায় এবার আর শহীদ বেদীতে যেতে পারবেন না বলে আক্ষেপ করছেন তিনি। যশোদা রাণী সরকারের উত্তরসূরি নীভা রাণি সরকার শোনালেন সেই ভয়াল দিনের কথা— কীভাবে তাঁর শাশুড়ির বুকে গুলি লেগেছিল আর শ্বশুর নীলমাধব সরকার একমাস গাছে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।
হারিয়ে যাওয়া পরিবার ও বন্ধ হওয়া পেনশন
খাঁপুরের সেই ২২ জন শহীদের পরিবারের অনেকেই এখন কুমারগঞ্জ, কুশমণ্ডি, কালিয়াগঞ্জ বা ইটাহারের মতো এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছেন। অনেকেই অনুষ্ঠানের খবরটুকুও পান না। বাম আমলের শহীদ পেনশন এখন বন্ধ বলে অভিযোগ তুলেছেন বাম কৃষক নেতা অমিত সরকার। তিনি জানান: ‘ ‘শহীদ পরিবারগুলোর জন্য আমাদের সরকার শহীদ পেনশন চালু করেছিল। এই সরকার তা বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কয়েকবছর আগে আমি নিজে সমস্ত শহীদ পরিবারগুলোর প্রজন্মরা কোথায় এখন আছেন তার একটা সার্ভে করেছিলাম। সেই রিপোর্ট এখনও আছে।’
যদিও তৃণমূলের দাবি, তারা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। বছর তিনেক আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জেলা সফরে এসে কিছু পরিবারের হাতে ৫০ হাজার টাকা করে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু শহীদ পরিবারের সদস্যা কেয়া দাসের দাবি, এককালীন টাকা নয়, একটি স্থায়ী চাকরি বা পেনশন পেলে অন্তত সম্মানের সাথে বাঁচা যেত।
তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার দিনাজপুর জেলার পতিরামের কাছে খাঁপুর গ্রামে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ২২ জন কৃষক—কিছু ইতিহাসবিদের মতে সংখ্যা ২৫। তাঁদের দাবি ছিল ‘তে-ভাগা চাই’। ১৯৪৬-৪৭ সালে দিনাজপুর, রংপুর ও জলপাইগুড়ি সহ ১৯টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। বর্গাদাররা জমিদার-জোতদারদের আধিয়ার প্রথার বিরুদ্ধে ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ নিজেদের অধিকারে রাখার দাবিতে আন্দোলনে সামিল হন। তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির নেতৃত্বে এই সংগ্রাম কৃষক আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে ওঠে।
রাজনীতির মঞ্চ বনাম বাস্তবের হাহাকার
বর্তমানে খাঁপুরে শহীদ দিবস পালনের মঞ্চটি রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে বামেদের হারানো জমি উদ্ধারের চেষ্টা, অন্যদিকে তৃণমূল ও বিজেপির আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। এই ত্রিভুজ যুদ্ধের মাঝে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান কি কেবল বছরের একটা দিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে? স্থায়ী পেনশন ও বাসস্থানের দাবি পূরণই হতে পারে তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
