শুভঙ্কর চক্রবর্তী
উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, খাদ্য-তৃণমূল আমলে নানা দপ্তরের দুর্নীতি ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। এসবের বাইরে নিঃশব্দে কাটমানি সিন্ডিকেট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা লুট হয়েছে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট রুরাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (ডিব্লউবিএসআরডিএ) বা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থায়। অন্যান্য প্রকল্পের কথা আপাতত সরিয়ে রাখলেও সুপরিকল্পিত উপায়ে শুধুমাত্র পথশ্রী প্রকল্পে (Pathashree Mission) রাস্তা তৈরিতেই দু’হাতে সরকারি অর্থ লুট করেছে ঠিকাদার সিন্ডিকেট৷ সংস্থার আধিকারিকদের একাংশের সঙ্গে মিলে চুপিসারে বছরের পর বছর বেআইনি কারবার চালিয়েছে সিন্ডিকেটের কারবারিরা।
কোথাও তৈরির কয়েকদিনের মধ্যে উঠে গিয়েছে পিচের চাদর, কোথাও কয়েক ঘণ্টায়। কোথাও আবার হাত দিয়েই তুলে ফেলা যাচ্ছে সদ্য নির্মীয়মাণ রাস্তার পিচের আস্তরণ। গত কয়েক বছরে সংবাদমাধ্যমে বা সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ এলাকার মানুষজন (North Bengal)। মালদা থেকে কোচবিহার, তৃণমূল আমলে উত্তরবঙ্গজুড়ে নিম্নমানের রাস্তা তৈরি নিয়ে হাজারো অভিযোগ সামনে এসেছে। সবথেকে বেশি অভিযোগ উঠেছে পথশ্রী প্রকল্প নিয়ে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই প্রকল্পের দায়িত্বে ছিল ডিব্লউবিএসআরডিএ। এত অভিযোগ উঠলেও সেই অর্থে আজ পর্যন্ত কোনও অভিযোগেরই সঠিক তদন্ত হয়নি।
উত্তরের আট জেলায় এজেন্সির যাবতীয় কাজ পরিচালিত হত জলপাইগুড়ি থেকে। অভিযোগ, সেটাই ছিল দুর্নীতির আঁতুড়। কাটমানি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত হত জলপাইগুড়ি থেকেই। প্রতিটি কাজে নির্দিষ্ট শতাংশের হারে কাটমানি ছাড়াও সিন্ডিকেটের কিছু অলিখিত নিয়ম মেনেই করতে হত রাস্তার কাজ। সেটাই সর্বনাশের শুরু। ভয়ে এতদিন মুখ না খুললেও ক্ষমতা পরিবর্তনের পর মুখ খুলছেন উত্তরের অনেক ঠিকাদার এবং এজেন্সির আধিকারিকরা। ইতিমধ্যেই এজেন্সির আধিকারিকদের কয়েকজন মিলে দুর্নীতির প্রামাণ্য নথি একত্রিত করে কীভাবে দুর্নীতি হত তা লিখিতভাবে রাজ্য সরকারের নবগঠিত দুর্নীতি দমন বিভাগে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
তৈরির কিছুদিনের মধ্যেই কেন ভেঙে যেত রাস্তা? প্রশ্নের উত্তরে একাধিক ঠিকাদার বিস্ময়কর তথ্য দেখিয়েছেন। মজবুত ও টেকসই রাস্তা তৈরির জন্য ভালো গুণগতমানের বিটুমেন, ক্যাটনিক এবং এলডিএ-এর ব্যবহার জরুরি। রাস্তার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে এই তিনটি উপাদান খুবই পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ। ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়েছেন, বিটুমেন বা সহজ ভাষায় যাকে পিচ বলা হয় তা রাস্তা তৈরির আসল ‘আঠা’ বা বাইন্ডার। রাস্তা তৈরির সময় পাথরকুচিগুলোকে একে অপরের সঙ্গে শক্ত করে ধরে রাখা এবং রাস্তাকে জলরোধী করে তোলাই এর প্রধান কাজ। ক্যাটনিক-এর বড় গুণ হল, ভেজা আবহাওয়া বা বৃষ্টির মধ্যেও পাথরের সঙ্গে খুব দ্রুত ও চমৎকারভাবে জুড়ে যায়। বিশেষ করে ভারী বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় বর্ষাকালে রাস্তা তৈরি বা জরুরি তাপ্পি দেওয়ার কাজে এটি অত্যন্ত কার্যকরী। এলডিএ একটি প্রযুক্তিগত উপাদান হিসেবে রাস্তা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। বিটুমেনের সঙ্গে পাথর যেন জল পেয়ে আলগা না হয়ে যায়, তার জন্য মিশ্রণে এক ধরনের বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। আবার অনেক সময় মিশ্রণের ফাঁকফোকর ভরাট করতে ফিলার হিসেবেও তা ব্যবহৃত হয়, যা রাস্তার স্থায়িত্ব বাড়ায়।
ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম- মূলত এই তিন সংস্থা থেকেই রাস্তা তৈরির ওই উপাদানগুলি কেনা হয়। এই তিন সংস্থার উপাদানগুলির গুণগতমান ভালো হিসাবেই ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু এসআরডিএ-তে কাটমানি সিন্ডিকেটের অলিখিত নিয়ম মেনে ঠিকাদারদের ওইসব উপাদান কিনতে হত কলকাতার একটি অনামী সংস্থা থেকে। সেই সংস্থার বিটুমেন বা ক্যাটনিকের গুণগতমান খারাপ হলেও দাম নেওয়া হত সরকারি সংস্থার চাইতেও বেশি। ঠিকাদারদের কাছে সেই সংস্থার কোড নেম ছিল ‘এ-ওয়ান’। সূত্রের খবর, শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, গোটা রাজ্যেই এসআরডিএ’র সব প্রকল্পের যাবতীয় সরঞ্জাম বেশি দামে বাধ্যতামূলকভাবে ঠিকাদারদের কিনতে হত ওই সংস্থা থেকেই। সংস্থার অবাঙালি মালিকের সঙ্গে পঞ্চায়েত দপ্তরের এক শীর্ষস্থানীয় আমলার লেনদেনের জেরেই সর্বত্র ওই অলিখিত নিয়ম চালু করা হয়েছিল। জলপাইগুড়ির এক ঠিকাদারের কথা, ‘কেউ ভালো কাজের জন্য অন্য সংস্থা থেকে বিটুমেন বা ক্যাটনিক কিনলে তার বিল পাশ হত না। নানা অছিলায় বিল আটকে দেওয়া হত। ইচ্ছে করে হয়রান করা হত। পরবর্তীতে বিলের কাগজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে সামগ্রী কেনার রসিদ জমা দিতে হত।’
অনামী সংস্থা থেকে সামগ্রী কেনায় কত টাকার হেরফের হত? কাগজকলমে হিসেব কষে তা বুঝিয়ে দেন এসআরডিএ’র এক ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর কথায়, ‘পথশ্রীর এক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করতে বিটুমেন, ক্যাটনিক এবং এলডিএ মিলিয়ে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার সামগ্রী দরকার। কলকাতার সংস্থা যে গুণগতমানের সামগ্রী সরবরাহ করে তার বাজারমূল্য খুব বেশি ধরলেও ২০ লক্ষ টাকা হবে না।’ অর্থাৎ এক কিমি রাস্তা তৈরির সামগ্রীর দামেই ১০ লক্ষ টাকার হেরফের। উত্তরবঙ্গে হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা তৈরির কাজে শুধু সামগ্রী কিনতেই কত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। রাজ্যের হিসেব ধরলে দুর্নীতির অঙ্ক আকাশছোঁয়া। আক্ষেপের সুরে ওই ইঞ্জিনিয়ার বলেন, ‘এরপর ঠিকাদারদের ১০-১২ শতাংশ হারে কাটমানি দিতে হত। এভাবে টাকা বিলির পর ঠিকাদাররা নিজেদের মুনাফা রাখত। ফলে কোনওভাবেই রাস্তার মান ভালো হওয়া সম্ভব নয়।’
