দেওয়াহাট: আমাদের আশপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনের ওপর দিয়ে একের পর এক ঝড় বয়ে গিয়েছে। তাঁরা শান্ত মাথায়, মুখে হাসি নিয়ে সমস্ত ঝঞ্ঝা, বিপদের প্রতিটা রাত পার করছেন। তেমনি একজন মানুষের নাম পাতানি বর্মন (Patani Barman)। তিনি কোচবিহার-১ ব্লকের গৌরাঙ্গবাজার এলাকার বাসিন্দা। ৮০ বছর বয়সেও অটুট তাঁর মনের জোর। স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার চালানোর জন্য ৩৫ বছর বয়সে চা, মিষ্টির দোকান খুলেছিলেন পাতানি। এখনও নিজেই সেই দোকান চালান। জীবন নিয়ে তাঁর কোনও অভিযোগ নেই। সবসময় একটা স্মিত হাসি তাঁর ঠোঁটে লেগে থাকে।
খুব অল্প বয়সে পাতানির বিয়ে হয়েছিল। কম বয়সেই চার সন্তানের জন্ম দেন তিনি। স্বামী নগেন বর্মন গ্রামে গ্রামে মিষ্টি ফেরি করতেন। হঠাৎ করে স্বামী মারা যাওয়ায় পাতানির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি হাট এলাকায় চা, মিষ্টির দোকান খোলেন। পাতানি বলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে বিভিন্ন মিষ্টি বানানো শিখিয়েছিলেন। সেটা খুব কাজে লেগেছিল। প্রথমদিকে খুব কষ্ট করে সংসার চালাতে হত। তারপর আস্তে আস্তে আমার বানানো খাবার মানুষের ভালো লাগা শুরু করে। সংসারে খানিক সাচ্ছল্য আসে।’ এখনও এই দোকানে মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। পাতানির হাতে তৈরি চা, শিঙাড়া, পুরি-তরকারি না খেলে তাঁদের শান্তি হয় না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পাতানির মেয়ের বিয়ে হয়েছে অনেক বছর হল। দুই ছেলে শ্রমিকের কাজ করেন। তাঁদের সংসার আলাদা। আর এক ছেলে মারা গিয়েছেন। পাতানি এখন বিধবা পুত্রবধূর সঙ্গে থাকেন। নাতি-নাতনি এখন রোজগার করছেন। এখনও দোকান চালাচ্ছেন কেন, প্রশ্নের উত্তরে একটু হেসে পাতানি বলেন, ‘যখন কিছুই ছিল না এই দোকানকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচেছি। সংসার খরচ থেকে ছেলেমেয়েদের মানুষ করা সবটাই এই দোকান থেকে হয়েছে। সেই দোকান বন্ধ করে দেব?’ তাঁর অবর্তমানেও যাতে দোকান চালু থাকে এখন সেই চেষ্টাই করছেন পাতানি। তাঁর পূত্রবধূকে হাতেকলমে সমস্ত শিখিয়ে দিচ্ছেন।
এই লড়াইয়ের জন্য গৌরাঙ্গবাজার হাইস্কুলের তরফে কয়েকদিন আগে পাতানিকে সম্মানিত করা হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক কান্তেশ্বর বর্মন বলেন, ‘কঠিন বাধার সামনে তিনি হেরে যাননি। বরঞ্চ নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।’
পাতানি হেরে যেতে পারতেন। থেমে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি লড়াই জারি রেখেছেন। নারী দিবসে পাতানির গল্প আমাদের শেখায় ধৈর্য ধরে, সৎ পথে টানা পরিশ্রম করে গেলে সমস্ত অন্ধকার কেটে যায়। কেটে যেতে বাধ্য। লড়াই করতে করতে অবসাদ আর হতাশা যখন আমাদের ছেঁকে ধরবে, তখন এই গল্প আমাদের মনে পড়বে। মনে পড়বে এক ৮০ বছরের বৃদ্ধা সমস্ত বিপদের চোখে চোখ রেখে গুনগুন করছেন, ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’, হতাশা কেটে যাবে।
