উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: ফের রক্তস্নাত পাকিস্তান (Pakistan)। শুক্রবার জুম্মার নমাজের পবিত্র লগ্নেই এক ভয়াবহ আত্মঘাতী গাড়িবোমা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাট (Kohat Blast)। পুরোনো পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন একটি মসজিদে হওয়া এই নারকীয় হামলায় এখনও পর্যন্ত কমপক্ষে ৩১ জনের প্রাণহানির খবর মিলেছে। আহতের সংখ্যা ৭৫ ছাড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের তালিকায় রয়েছেন অন্তত ১৬ জন পুলিশ আধিকারিক। এই হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রের খবর, শুক্রবার নমাজ চলাকালীন আচমকাই একটি বিস্ফোরকবোঝাই গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে এসে ওল্ড পুলিশ লাইন্সের প্রবেশদ্বারে সজোরে ধাক্কা মারে। বিকট শব্দের বিস্ফোরণে মসজিদের একাংশ এবং পুলিশ লাইন্সের বিস্তীর্ণ অংশ কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় থানার বাইরের একটি আস্ত দেওয়াল। খবর পেয়েই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উদ্ধারকারী দল। আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়, যার ফলে প্রাণহানি কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব হয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়ার (Khyber Pakhtunkhwa) পুলিশ প্রধান জুলফিকার আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, এটি মসজিদে চালানো একটি পরিকল্পিত আত্মঘাতী হামলা।
বিস্ফোরণের অব্যবহিত পরেই গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্তত দুই সশস্ত্র জঙ্গি পুলিশ লাইন্স কম্পাউন্ডের ভেতরে জোরপূর্বক ঢোকার চেষ্টা চালায়। সঙ্গে সঙ্গেই পাহারায় থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে তাদের তীব্র গুলির লড়াই শুরু হয়। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, পুলিশের পালটা অভিযানে সব মিলিয়ে সাতজন হামলাকারীকে খতম করা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে কেউ হামলার দায় স্বীকার না করলেও, শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP) প্রকাশ্যে এই নাশকতার দায় নেয় (Terror Assault)। জানা গিয়েছে, টিটিপি-র সহযোগী ‘ইত্তেহাদ-উল-মুজাহিদিন’ তথা হাফিজ গুল বাহাদুর গোষ্ঠীর নেতৃত্বেই এই অপারেশন চালানো হয়েছে। ঠিক আগের দিনই নিকটবর্তী হাঙ্গু জেলায় একটি আইইডি বিস্ফোরণে ছ’জন সেনা জওয়ানের মৃত্যু হয়েছিল, যা সীমান্ত সংলগ্ন এই অঞ্চলে ধারাবাহিক সন্ত্রাসের ইঙ্গিত দেয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই ঘৃণ্য ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন এবং উদ্ধারকাজ দ্রুত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এই ঘটনার জেরে ফের একবার পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা চরমে উঠেছে। ইসলামাবাদের সরাসরি অভিযোগ, আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করেই পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালানো হচ্ছে। যদিও প্রতিবেশী কাবুল সরকার সেই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে খারিজ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, আফগান প্রশাসনের পরোক্ষ মদতেই টিটিপি-র মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি বর্তমানে পাকিস্তানে শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার নীল-নকশা তৈরি করছে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ তথা বেলফাস্ট কুইন্স ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং প্রফেসর মাইকেল সেম্পেল সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘হামলার যা প্যাটার্ন, তার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে এই জঙ্গিদের মদত দিচ্ছে আফগান তালিবান। শুধু টিটিপি নয়, আল-কায়দাকেও একই ধরনের হামলার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে।’

