সায়নদীপ ভট্টাচার্য ও বাবাই দাস, বক্সিরহাট ও তুফানগঞ্জ: শুক্রবার সাতসকালে তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের মহিষকুচি গ্রামে ভিক্ষার ঝুলি হাতে বাড়ি বাড়ি ঘুরছিলেন সত্তরোর্ধ্ব বীণা মহন্ত। এই বয়সে ভিক্ষা করছেন কেন? প্রশ্ন শুনে থমকে দাঁড়ালেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে জানালেন, জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। তিন কূলে কেউ নেই। ভিক্ষা করে পেট চালাতেন। তিন বছর আগে ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষভাবে সক্ষম বীণার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তৈরির পাশাপাশি বার্ধক্য ভাতার (Outdated Age Pension) আবেদন জমা দেওয়া হয়। তারপর থেকে মাসে ১ হাজার টাকা করে পেতেন। তা দিয়ে কোনওক্রমে চলে যেত। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পর থেকে তিনি সেই ভাতা পাননি। অন্যের সহযোগিতায় বারবার ব্যাংকে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছেন। এদিকে, শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও ওষুধ কেনার টাকা নেই। তাই বাধ্য হয়ে পুনরায় ভিক্ষা করতে পথে নেমেছেন। এই পরিস্থিতি শুধু বীণার নয়, দু’মাস ধরে বার্ধক্য ভাতা না মেলায় গোটা তুফানগঞ্জ মহকুমার ছবিটা প্রায় একই। কেউ হন্যে হয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। কেউ আবার টাকা না মেলায় ভিক্ষার ঝুলি ধরেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্য সরকার বেশ কয়েকটি নতুন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঘোষণা করেছে। কিন্তু এসবের মাঝেও মন খারাপ ষাটোর্ধ্বদের। কারণ, প্রায় দুই মাস ধরে তাঁরা বার্ধক্য ভাতা পাননি। কবে সেই টাকা ঢুকবে, সেটাও অনিশ্চিত। প্রশাসন সূত্রে খবর, গত মে মাসের টাকা এখনও বকেয়া। এদিকে জুন মাসের ১৯ তারিখ পেরিয়ে গেলেও ভাতার টাকা না মেলায় অনেকের সংসার চালানোর পাশাপাশি ওষুধপত্র কিনতে সমস্যা হচ্ছে। দু’মাস আগেও যেখানে মাসের প্রথমেই অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকত সেখানে মে মাসের টাকা এখনও না আসায় প্রবীণরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। যদিও তুফানগঞ্জ মহকুমা শাসক দপ্তরের এক আধিকারিকের আশ্বাস, ‘নথি যাচাই প্রক্রিয়া চলছে। অনেকের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে গিয়েছে। বাকিদেরও বার্ধক্য ভাতার টাকা শীঘ্রই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে।’
এদিন তুফানগঞ্জ শহরের কাছারি মোড় এলাকার সাইবার ক্যাফের লাইনে চুনিবালা বিশ্বাস দাঁড়িয়ে ছিলেন। সত্তরোর্ধ্ব ওই বৃদ্ধা মনে একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে দোকানদারকে বললেন, ‘দাদুভাই আমার ভাতার টাকাটা ঢুকল কি না একটু দেখে দাও না!’ বিগত দু’মাস টাকা না মিললেও আশা ছিল হয়তো এই মাসে পাবেন। কিন্তু কম্পিউটারের স্ক্রিনে জিরো ব্যালেন্স ভেসে উঠতেই মুহূর্তে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি বিষণ্ণ মুখে ফিরে গেলেন। প্রবীণদের এই অসহায়তা দেখে নিজেদের চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না সাইবার ক্যাফের কর্মীরাও। শহরে এক সাইবার ক্যাফের মালিক দীপঙ্কর সাহা বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল হতেই ওঁরা আসতে শুরু করেন। কারও বয়স ৭০, কারও ৮৫। এই গরমে শুধু ওষুধ কেনার টাকাটা অ্যাকাউন্টে ঢুকল কি না এটুকু জানতে হেঁটে আসেন। যখন জানতে পারেন, টাকা আসেনি চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সরকার এঁদের কষ্টটা একটু বুঝুক।’

