শুভঙ্কর চক্রবর্তী : ভেঙে পড়েছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো। আর তার জেরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থার কাছে মাথানত করতে হল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। বিপাকে পড়ে লিখিতভাবে সংস্থার ডিরেক্টরের কাছে দুঃখপ্রকাশ করতে বাধ্য হলেন ডিন বিকাশচন্দ্র মণ্ডল। চিঠি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক গাফিলতির দায় স্বীকার করে নিলেন জয়েন্ট রেজিস্ট্রার স্বপনকুমার রক্ষিত। সে খবর সামনে আসতেই হইচই পড়েছে ক্যাম্পাসে। সকলেই বলছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন কাণ্ড নজিরবিহীন।
গোটা ঘটনায় প্রশাসনিক কাজে ডিনের অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং সময় ও সুযোগ থাকতেও পরীক্ষা সংক্রান্ত সমস্যা না মেটানোয় সদ্য প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ভাস্কর বিশ্বাসের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। বকেয়া ১ কোটি ১৯ লক্ষ টাকা না মেটানো পর্যন্ত পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বরাতপ্রাপ্ত সংস্থা। তা নিয়েই তৈরি হয় সমস্যা। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের ১৩টি কলেজের স্নাতকোত্তরের পরীক্ষা। ৭ জুলাই থেকে দ্বিতীয় এবং চতুর্থ সিমেস্টারের পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল। ২৩ জুন থেকে পরীক্ষার ফর্ম ফিলআপের শুরুর বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছিল পরীক্ষা নিয়ামক বিভাগ। বরাতপ্রাপ্ত সংস্থা বেঁকে বসায় সবকিছুই ভেস্তে যায়।
সমস্যা মেটাতে দফায় দফায় বৈঠক করেন শিক্ষক ও আধিকারিকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিকদের একাংশ বরাতপ্রাপ্ত সংস্থার ডিরেক্টরকে বুঝিয়ে কাজের জন্য রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তারমধ্যেই ২ জুলাই হঠাৎ করেই রবাতপ্রাপ্ত সংস্থার ডিরেক্টরকে চিঠি পাঠান ডিন। সেই চিঠিতে পরীক্ষা নিয়ে সমস্যার জন্য তিনি সংস্থাকেই দায়ী করেন। তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তাঁদের অপমান করা হয়েছে উল্লেখ করে কোনওভাবেই টাকা না পেলে কাজ করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন ডিরেক্টর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে বুঝতে পেরে শুক্রবার জয়েন্ট রেজিস্ট্রারের ঘরে বৈঠকে বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স কাউন্সিলের কিছু সদস্য। সেখান থেকেই ২ জুলাই পাঠানো চিঠি প্রত্যাহার এবং দুঃখপ্রকাশ করে সংস্থার ডিরেক্টরকে ই-মেল করেন বিকাশ। এরপর সেদিনই জয়েন্ট রেজিস্ট্রার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাডে সংস্থার ডিরেক্টরকে আরেকটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে ডিনের দুঃখপ্রকাশের কথা উল্লেখ করা হয় এবং স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয়, পরীক্ষা নিয়ে জটিলতার জন্য সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সমস্যার জন্যই পরীক্ষা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে সেকথাও লেখেন জয়েন্ট রেজিস্ট্রার। সংস্থার পাওনাও দ্রুত মিটিয়ে দেওয়া হবে বলেই জানান তিনি।
সেই চিঠি পাওয়ার পর কাজ করতে রাজি হয় বরাতপ্রাপ্ত সংস্থা। সংস্থার ডিরেক্টর ডি মণ্ডল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুঃখপ্রকাশ করে চিঠি দিয়েছে। বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সেই কথায় ভরসা করে এবং ছাত্রছাত্রীদের কথা মাথায় রেখেই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ সমস্যা মিটে যাওয়ায় শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরীক্ষা নিয়ামক শংকরী চক্রবর্তী স্নাতকোত্তরের ফর্ম ফিলআপ ও পরীক্ষার সময়সীমা উল্লেখ করে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, ৬ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত অনলাইন ফর্ম ফিলআপ চলবে। ১৬ জুলাই অ্যাডমিট কার্ড দেওয়া হবে এবং ৭ জুলাই থেকে যে পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল তা ১৭ জুলাই থেকে শুরু হবে।
এই জটিলতার জন্য ভাস্করকেই দায়ী করেছেন ডি মণ্ডল। তাঁর কথা, ‘দু’মাস আগে থেকে বারে বারে চিঠি দিয়ে বকেয়ার কথা বললেও তা নিয়ে মাথা ঘামাননি ভাস্কর। ইচ্ছে করেই জটিলতা তৈরি করে আমাদের বদনাম করতে চেয়েছেন।’ স্বপনও সেকথা মেনে নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আর্থিক সমস্যা ছিল না। সংস্থার বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া জন্য ১৪ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ভাস্কর বিশ্বাসের কাছে ফাইল পাঠিয়েছিলেন ফিন্যান্স অফিসার। সেটা কী কারণে আটকে রাখা হয়েছিল জানি না। টাকা দিয়ে দিলেই সমস্যা মিটে যেত। ডিন নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করে ঠিক করেননি। তা তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
২৫ জুন পর্যন্ত ভাস্কর রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে ছিলেন। ফোনে যোগাযোগ করতে না পারার জন্য তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। তবে শুধু বরাতপ্রাপ্ত সংস্থার ডিরেক্টরকেই নয়, জয়েন্ট রেজিস্ট্রার, ফিন্যান্স অফিসার এবং সহকারী পরীক্ষা নিয়ামককেও বিভিন্ন সময় নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডিনের বিরুদ্ধে। অ্যাকাডেমিক প্রধান হয়েও কেন তিনি বারে বারে প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন তার কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি ডিন। প্রতিটি প্রশ্নেই তিনি আমতা আমতা করেন। কোনও সময় বলেন, ‘ছাত্র স্বার্থে করেছি’, কোনও সময় বলেন, ‘প্রশাসনের নির্দেশে করেছি’। যদিও কোন প্রশাসন তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিল তা অবশ্য বলতে পারেননি বিকাশ।

