North Bengal Catastrophe | উত্তর ভেসে গেলেও চুপ থাকে নবান্ন

North Bengal Catastrophe | উত্তর ভেসে গেলেও চুপ থাকে নবান্ন

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


এম আনওয়ারউল হক ও আজাদ, বৈষ্ণবনগর: বিপর্যয়েও ‘আমরা–ওরা’র বিভেদটা স্পষ্ট। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে কলকাতা স্তব্ধ। বেশ কয়েকটি তাজা প্রাণের অকালেই চলে যাওয়া। তড়িঘড়ি রাজ্যজুড়ে ছুটির ঘোষণা। সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, অফিস, সবই বন্ধ। অথচ সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের (North Bengal Catastrophe) গঙ্গা-ফুলহর-কালিন্দীর দাপটে গ্রাম-শহর, স্কুলঘর-খেলার মাঠ, কৃষকের ফসলি জমি আর সাধারণ মানুষের ঘরদুয়ার ভেসে গিয়েছে। সেই সময় কিন্তু প্রশাসনের তরফে সেভাবে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। বাসিন্দারা প্রচণ্ড সমস্যায় পড়লেও রাজ্যের শীর্ষ মহল একপ্রকার নির্বাকই। উত্তরবঙ্গ যেন এই রাজ্যের অচ্ছুত অংশ। এখানকার মানুষের কান্না নবান্নের চৌহদ্দিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ।

ভূতনির নৌকায় ভাসতে ভাসতে যে কিশোরী পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছায়, তার হাতে ভিজে যাওয়া খাতা, বুকে ভয়, চোখে আকুতি, ‘আমাদেরও মানুষ বলে মনে করুন। আমাদেরও বাঁচান।’ শিক্ষক নেতা নাসিরউদ্দিন মিয়াঁর প্রশ্ন, ‘উত্তরবঙ্গের মানুষ কি তবে অন্য বাংলার? কলকাতার সামান্য দুর্ভোগেই সরকার এত মানবিক হয়ে ওঠে, কিন্তু ভূতনি, কালিয়াচক বা বৈষ্ণবনগরের মানুষকে কি মানুষ বলে গণ্য করা হয় না?’

ভূতনি দ্বীপের মানুষ প্রতি বছর আতঙ্কে দিন কাটান। কবে বাঁধ ভাঙবে, কবে গঙ্গা-ফুলহরের জলে ভেসে যাবে তাঁদের ভিটেমাটি, সেই আশঙ্কা সদাই তাঁদের গিলে খায়। গত ১৩ অগাস্ট দক্ষিণ চণ্ডীপুরে ফুলহরের প্রচণ্ড স্রোতে বাঁধ ভেঙে মুহূর্তের মধ্যে ভূতনির বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়। ১৮ অগাস্ট থেকে ভূতনির ৪৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটিতে পঠনপাঠন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। অথচ অনেক স্কুলে জল ঢুকে গেলেও সেখানে পঠনপাঠন চালু রাখার অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কী কারণে এই সিদ্ধান্ত, তা শিক্ষক থেকে অভিভাবক, অনেকেরই বোধগম্য হয়নি। এখানেই শেষ নয়।

১২ সেপ্টেম্বর পশ্চিম রতনপুরে সদ্যনির্মিত রিং বাঁধ ভেঙে ভূতনির অন্তত ১৫টি গ্রাম ফের প্লাবিত হয়। ভূতনির ৪৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চারটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পঠনপাঠন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে বলে ১৭ সেপ্টেম্বর অবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিন্তু এখানেই দাঁড়ায় অমানবিকতার প্রশ্ন। স্কুলঘর, হাসপাতাল, থানা, রাস্তাঘাট—সবকিছু জলে ডুবে গেলেও তিনটি উচ্চমাধ্যমিক কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ হয়নি। পরীক্ষার্থীরা নৌকায় পেরিয়ে, ট্র্যাক্টর-ট্রলিতে বসে, বুকজল ঠেলে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছে। সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে অনেককে রীতিমতো ভয় পাইয়ে দিয়েছে। মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরীক্ষাকেন্দ্র বদল করে মানিকচক কলেজে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েও রহস্যজনক কারণে তা বদলে দেওয়া হয়। প্রশাসনের যুক্তি ছিল পরীক্ষার্থীরাই নাকি ভূতনি ছাড়তে রাজি নয়। শিক্ষা মহল অবশ্য তা মানতে রাজি নয়। প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক জ্যোতিভূষণ পাঠক ক্ষুব্ধ, ‘এটা চরম লজ্জার। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কোনওদিন বন্যার মধ্যে এভাবে পরীক্ষা হয়নি।’ বন্যা পরিস্থিতিকবলিত শোভাপুর অঞ্চলের ছাত্রী রেজিনা খাতুন অসহায়, ‘সমস্ত বইখাতা ভিজে গিয়েছে। ক্লাস নেই, স্কুলঘর ভেসে গিয়েছে। তবুও পরীক্ষা দিতে হবে। আমরা কোন দোষ করেছি?’

চিনাবাজারের রাজেন সরকার ক্ষোভে ফেটে পড়েন, ‘নদী আমাদের ঘরবাড়ি গিলে খেয়েছে। খাবার নেই, ওষুধ নেই। অথচ কলকাতায় বৃষ্টি হলেই সরকার চোখে জল আনে, স্কুল বন্ধ করে।’ কংগ্রেসের শিক্ষক সংগঠনের নেতা আখতারুজ্জামানের তীব্র কটাক্ষ, ‘এ শুধু শিক্ষা নয়, এ এক দীর্ঘদিনের অবহেলার ইতিহাস।’ বছরের পর বছর গঙ্গা-ফুলহরের ভাঙন, বন্যা পরিস্থিতি, নদীভাঙনে গৃহহারা মানুষ—সবই যেন উত্তরবঙ্গবাসীর জীবনের অনিবার্য পরিণতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, মঙ্গলবার বিকেল থেকে পঞ্চানন্দপুরের সুলতানটোলায় আচমকাই ভাঙন শুরু হয়। প্রায় ১৫ দিন ধরে গঙ্গার ভাঙন চলছে। বিঘার পর বিঘা আবাদি জমি গঙ্গায় তলিয়ে গিয়েছে। গ্রাম থেকে প্রায় ৫০টিরও বেশি বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেকেই ত্রিপল খাটিয়ে নিজেদের ভিটেয় কোনওরকমে বসবাস করছেন। এদিনের ভাঙনে তাঁরা ফের দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে শাহিন আলি বলে চলেন, ‘নদী ‌দু’‌দিন শান্ত ছিল। এদিন বিকেল থেকে ফের অশান্ত হল। বেশকিছু চাষের জমি তলিয়ে গিয়েছে। গঙ্গা ধীরে ধীরে বসতির দিকে ধেয়ে আসছে। ইতিমধ্যে বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গিয়েছি। ত্রিপল খাটিয়ে কোনওরকমে বেঁচে আছি।’

শাহিনের বক্তব্য রাজ্যের শীর্ষ মহলে পৌঁছাবে কি? কেউ জানে না।

(তথ্য সহযোগিতায় সেনাউল হক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *