উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ নেপালের প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যা (Nepal Floods) এবং সর্বগ্রাসী ভূস্বর্গীয় তাণ্ডবের মাঝে বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন ৯৭ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা। কাদা-মাটিতে ঢাকা জেসিবি এক্সকাভেটর বা জেসির স্কুপে তাঁর বসে থাকা একটি ছবি এখন বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে দাগ কেটেছে। এই প্রবীণ নারীর নাম গুণা মায়া বোহারা (Guna Maya Bohara); যাকে নুওয়াকোটের নদী তীরবর্তী জনপদ দেবীঘাটের একটি প্রবীণ নিবাসের ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
দেবীঘাটের ‘সিনিয়র সিটিজেনস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’-এর এই বাসিন্দা প্রলয়ঙ্করী এই দুর্যোগে নিজের সাতজন সহপাঠী ও সহবাসীকে হারালেও নিজে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন। বর্তমানে এই বৃদ্ধাশ্রমের বেঁচে থাকা অন্য প্রবীণদের সঙ্গে তাঁকেও কাঠমান্ডুর একটি নিরাপদ অস্থায়ী আশ্রয়ে বিমানে করে নিয়ে আসা হয়েছে।
কাঠমান্ডুর সেই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবীণরা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করেছেন। সেখানকার এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, হুট করে নেমে আসা এই প্রলয়ের কোনো পূর্বাভাস তাঁরা পাননি। সকালের খাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তাঁরা দেখেন ভবনের ছাদ দুলছে। এরপর সবাই উচ্চ ভূমির দিকে দৌড়ানোর চেষ্টা করলেও প্রায় ছয়-সাতজন প্রবীণ সেই স্রোত থেকে রক্ষা পাননি।
স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী জানান, বন্যা আঘাত হানার প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্থানীয় কিছু তরুণের একটি দল বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছায়। ততক্ষণে পাহাড়ি ঢলের জল ও টন টন পলিমাটিতে সম্পূর্ণ শহরটি ঢেকে গিয়েছিল। নুওয়াকোটের (Nuwakot) একটি স্থানীয় আয়ুর্বেদিক হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁদের হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুতে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে সেখানে তাঁদের খাদ্য, বস্ত্র, নার্সিং কেয়ার এবং নিয়মিত মেডিকেল চেকআপের সুব্যবস্থা করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া প্রবীণদের স্বাস্থ্য এখন স্থিতিশীল রয়েছে এবং তাঁরা ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন। গুণা মায়া বোহারা সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, ঘটনার দিন তিনি নিচতলার নিজের ঘরেই ছিলেন। তাঁর পায়ে জন্মগত অক্ষমতা এবং বন্যায় হাতে আঘাত পেলেও তাঁর বেঁচে থাকার তীব্র জেদ তাঁকে টিকিয়ে রেখেছিল। ঘরের জানালা খুলে শুধু মাথাটুকুকে জলের ওপরে তুলে ধরে তিনি একটানা ২ থেকে ৩ ঘণ্টা ডুবে ছিলেন। পরবর্তীতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা এসে কেবল মাথাটি বেরিয়ে থাকা অবস্থায় পলিমাটি থেকে তাঁকে উদ্ধার করেন।
এদিকে এই ভয়াল আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,২৫২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং প্রায় ৪,২১৬ জন মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে, তিব্বতের চীনা রাষ্ট্রীয় মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী সেখানে আরও ৫৪১ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যার ফলে এই দুই অঞ্চলে মোট নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪,৭৫৭ জনে।
নেপালি সেনা জওয়ান এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞ সহ উদ্ধারকারী দলগুলো এখনও বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া জীবিতদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। এক্সকাভেটর ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই উদ্ধারকাজ এখনও পুরোদমে অব্যাহত রেখেছে নেপালি সেনাবাহিনী।

