নীতেশ বর্মন, শিলিগুড়ি: সরকারি নিয়মকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক দুর্নীতি! উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের (এনবিএসটিসি) বাসে মহিলা যাত্রীদের বিনামূল্যে যাতায়াতের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে (NBSTC Bus Corruption)। এই ঘটনায় অভিযুক্ত কনডাক্টরদের একাংশ।
অভিযোগ, বাসে মোট যাত্রীর ৭০-৮০ শতাংশ মহিলা যাত্রী দেখানো হচ্ছে। এই অস্বাভাবিক হিসেবে কার্যত চোখ কপালে উঠেছে নিগমের আধিকারিকদের। বিষয়টি নজরে আসতেই অভিযুক্ত কনডাক্টরদের কাজ থেকে বসিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া মাত্রই সেই হিসেব নিমেষে ৪০-৫০ শতাংশে নেমে আসে বলে খবর। মূলত বিনামূল্যে বাসযাত্রার সুযোগকে হাতিয়ার করেই এই বিপুল অর্থের দুর্নীতি করা হচ্ছে (Pretend Zero-Steadiness Tickets)।
কীভাবে চলছে দুর্নীতি? সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি বাসে ওঠা মহিলাদের জিরো ব্যালেন্সের (ভাড়াহীন) টিকিট দেওয়া হয়। বাস ডিপোয় ফেরার পর কনডাক্টর সেই টিকিটের হিসেব জমা দেন। নিগমের আধিকারিকরা সেই হিসেব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর পর তা পরিবহণ দপ্তরে যায়। এই হিসেবের ভিত্তিতেই পরিবহণ দপ্তর নিগমকে ভাড়ার টাকা মিটিয়ে দেয়। অভিযোগ, রাস্তায় পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের সুযোগ নিচ্ছেন কয়েকজন কনডাক্টর। বাসে মহিলা যাত্রী না থাকলেও, ইচ্ছেমতো জিরো ব্যালেন্সের টিকিট কেটে রেখে দেওয়া হচ্ছে। পরে সেই ‘ভুয়ো’ হিসেব দেখিয়ে দপ্তরের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে নিগমের আধিকারিকদের একাংশও জড়িত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমানে এনবিএসটিসি-র ৩৬টি বাস চুক্তির ভিত্তিতে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে চালানো হয়। এই বাসগুলিতে ‘ই-পস’ মেশিনের বদলে পুরোনো পদ্ধতিতে কাগজের টিকিট দেওয়া হয়। এদিকে, মহিলাদের বিনামূল্যে যাত্রার জন্য নিগমের তরফে তাঁদের নির্দিষ্ট ফরম্যাট দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, সংস্থা পরিচালিত এই বাসগুলিতেই মহিলা যাত্রীদের টিকিটের হিসেবে সবচেয়ে বেশি গড়মিল দেখা গিয়েছে। মুনাফা বাড়াতে বেসরকারি সংস্থাগুলি মহিলা যাত্রীর সংখ্যা ২০-৩০ শতাংশের জায়গায় ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত দেখাচ্ছে।
অন্যদিকে, ইতিমধ্যে মহিলাদের বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য পরিবহণ দপ্তরের তরফে এনবিএসটিসি-কে ১২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। পরে প্রতি মাসের হিসেব অনুযায়ী দপ্তর টাকা মেটাবে। তবে দুর্নীতির রাশ টানতে কড়া অবস্থান নিয়েছে নিগম। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সংস্থা পরিচালিত বাসগুলিতে মহিলা যাত্রীর সংখ্যা ৩০ শতাংশের বেশি দেখালে, সেই সংস্থাকে আর বাস দেওয়া হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিগমের এক আধিকারিকের কথায়, ‘বেসরকারি সংস্থা দ্বারা চালিত বাসগুলিতে আগে থেকেই নজরদারির অভাব রয়েছে। এই সুযোগে জিরো ব্যালেন্সের টিকিটের ভুয়ো হিসেব দিচ্ছেন কিছু কনডাক্টর। কারণ, রাস্তায় মহিলা যাত্রী না থাকলেও যে কোনও সময় সেই টিকিট কেটে রেখে দিচ্ছেন কনডাক্টররা।’
এই বিষয়ে নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দীপঙ্কর পিপলাইয়ের বক্তব্য, ‘আমরা চেকিং বৃদ্ধি করব। রাস্তায় মহিলা যাত্রীর নামে ভুয়ো জিরো ব্যালেন্সের টিকিট যাতে কাটা না হয়, আধিকারিকরা তা দেখবেন। বাসগুলিতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হবে।’
যদিও এই পদ্ধতি কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা, এমনিতেই বর্তমানে নিগমে কর্মীসংকট চরমে, টিকিট চেকিং অফিসারের সংখ্যা খুব কম। ফলে অনেক বাসেই নিয়মিত চেকিং হয় না। তাই পদক্ষেপের কথা বললেও আগামীদিনে এই ব্যবস্থার কতটা বদল হবে, তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে। পাশাপাশি, বহু বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও সেগুলি বিকল। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিকল ক্যামেরাগুলি দ্রুত সচল করা হবে এবং যে বাসগুলিতে ক্যামেরা নেই, সেগুলিতে নতুন করে লাগানো হবে।
