শুভঙ্কর চক্রবর্তী
শিলিগুড়ি করিডর (Siliguri Hall) বা ‘চিকেন নেক’ (Rooster Neck) নিয়ে গত কয়েক দশকে ভূ-রাজনৈতিক আলোচনার অন্ত নেই। কিন্তু সেই আলোচনার চাকা বরাবরই থমকে গিয়েছে কেবল সামরিক কৌশল আর মানচিত্রের কাঁটাতারের হিসেবে। এবার দিল্লির ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিওন’ বা এনসিআর-এর ধাঁচে শিলিগুড়িকে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন’ (Nationwide Strategic Area) বা এনএসআর (NSR) হিসেবে গড়ে তোলা নিয়ে রাজধানীতে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা শুরু হল। সূত্রের খবর, সেনার অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে চর্চা হচ্ছে। সম্প্রতি একাধিক জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সি ওই বিষয়ে দিল্লিতে তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের একমাত্র যোগসূত্র লুকিয়ে রয়েছে উত্তরবঙ্গের বুকেই। যে সংকীর্ণ ভূখণ্ডটি ‘চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডর নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, তা কেবল একটি ট্রানজিট রুট নয়, ভারতের জাতীয় সুরক্ষা এবং অখণ্ডতার অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র। এই করিডরের একদিকে নেপাল, অন্যদিকে বাংলাদেশ এবং ভুটান। আর সামান্য উত্তরেই রয়েছে চিন অধিকৃত তিব্বত এবং স্পর্শকাতর চুম্বি উপত্যকা। ডোকালাম বিতর্কের পর এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব যে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তা প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। জাতীয় সুরক্ষার এত বড় একটি ভরকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও, শিলিগুড়ি, সংলগ্ন ডুয়ার্স এবং দার্জিলিং পাহাড়কে নিয়ে আজ পর্যন্ত সুসংহত এবং দূরদর্শী কোনও জাতীয় স্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হওয়ায় আক্ষেপ করেছেন একাধিক জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সির কর্তারা। তাঁদের যুক্তি, যুগের পর যুগ ধরে এই অঞ্চলটি কেন্দ্র এবং রাজ্যের বিচ্ছিন্ন কিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সাক্ষী থেকেছে মাত্র। এই খণ্ডিত উন্নয়নের ধারা থেকে বেরিয়ে এসে এবার জাতীয় প্রয়োজনে এনএসআর গঠন জরুরি।
দিল্লির (Delhi) এনসিআর (NCR) যেমন রাজধানী এবং তার পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির মধ্যে একটি সুসংহত নগরোন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং অর্থনীতির সেতুবন্ধন করেছে, ঠিক তেমনই শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতলকে মিলিয়ে এই স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গঠন করা যেতে পারে বলেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, এই বিশেষ অঞ্চলের জন্য সংবিধানে বা প্রশাসনিক স্তরে বিশেষ ক্ষমতার সংস্থান থাকবে। প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পর্যটনের মতো বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে এই অঞ্চলের জন্য আলাদা বাজেট এবং সেন্ট্রাল প্ল্যানিং বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। যেখানে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কেন্দ্রের সরাসরি নজরদারি এবং রাজ্যের সমান অংশীদারিত্ব থাকবে। বর্তমানে এই অঞ্চলে সেনা, বায়ুসেনা এবং আধাসামরিক বাহিনীর বিশাল উপস্থিতি রয়েছে। নিরাপত্তা এজেন্সিগুলি মনে করছে, সামরিক পরিকাঠামোর পাশাপাশি অসামরিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন যদি সমান্তরালভাবে না হয়, তবে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এনএসআর গঠিত হলে বাগডোগরা বিমানবন্দর, নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন, এশিয়ান হাইওয়ে এবং পাহাড়ের বিকল্প সড়কগুলির আধুনিকীকরণ একটি ছাতার তলায় আসবে। শুধু সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নয়, ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’-র সফল রূপায়ণের জন্যও এই স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গেম চেঞ্জার হতে পারে। কারণ, এই করিডর দিয়েই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের স্থলপথের বাণিজ্যের সিংহভাগ পরিচালিত হবে।
বিশেষ সূত্রের খবর, বিশেষজ্ঞদের একটি দল বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এই মুহূর্তে শিলিগুড়ি এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ট্রাফিক যানজট এবং উপযুক্ত শিল্প পরিকাঠামোর অভাব বিশ্বমানের বাণিজ্যের পথে বড় বাধা। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই এলাকাকে এনএসআর ঘোষণা করে স্পেশাল ইকনমিক জোন এবং লজিস্টিক হাব গড়ে তোলা হয়, তবে এই অঞ্চলের চেহারাই বদলে যাবে। দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনুন্নয়নের যে ক্ষোভ মাঝে মাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, এই স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন তারও এক স্থায়ী সমাধানসূত্র হতে পারে। পাহাড়ের ইকো-ট্যুরিজম, চা শিল্প এবং বনজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে যদি এই মাস্টার প্ল্যানের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে স্থানীয় যুবসমাজের ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। বেকারত্বের অন্ধকার ঘুচলে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাধারা এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়বে। জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সির এক পদস্থ কর্তার মতে, ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গঠন হলে রাজ্য তার ভৌগোলিক সীমানা হারাবে না, বরং কেন্দ্রের বিপুল বিনিয়োগ এবং সুসমন্বয়ের ফলে উত্তরবঙ্গ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত হবে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ব্লু-প্রিন্ট ঠিক কেমন হবে এবং কীভাবে কেন্দ্র ও রাজ্য একযোগে এই রূপরেখা কার্যকর করতে পারে, তা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট দিশা থাকা প্রয়োজন।’
দিল্লি সূত্রের খবর, এনসিআর-এর অনুকরণে এনএসআর-এর জন্য একটি ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন প্ল্যানিং বোর্ড’ গঠন করার প্রস্তাব উঠে এসেছে। সেই বোর্ডে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, সড়ক ও পরিবহণ এবং অর্থ মন্ত্রকের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের শীর্ষ আমলা ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্তারা থাকবেন। এই যৌথ কাঠামোর মূল সুবিধা হল, এটি রাজ্যের যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো বা সীমানায় কোনও আঘাত করবে না, বরং উন্নয়ন ও সুরক্ষার স্বার্থে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
দিল্লির কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্ট্র্যাটেজিক রিজিওনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানে। শিলিগুড়ি ইতিমধ্যেই উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার। এই অঞ্চলকে যদি বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন এনএসআর হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তবে এখানে বড় মাপের ‘ড্রাই পোর্ট’ তৈরি করা সম্ভব। নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি হয়ে উঠবে প্রধান ক্লিয়ারিং এবং লজিস্টিক হাব। এর ফলে পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং সাপ্লাই চেনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি, এই কাঠামোর অধীনে দার্জিলিং এবং কালিম্পং পাহাড়ের পরিকাঠামোকে বিশ্বমানের করে তোলার জন্য বিশেষ কেন্দ্রীয় তহবিল বরাদ্দ করা সম্ভব। পাহাড়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করে সেখানে আন্তর্জাতিক মানের হসপিটালিটি সেক্টর, ওয়েলনেস ট্যুরিজম এবং আইটি পার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। এনএসআর-এর তকমা থাকলে এই অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ টানাও অনেক সহজ হবে, কারণ লগ্নিকারীরা তখন জানবেন যে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দায়িত্ব স্বয়ং ভারত সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। এছাড়া, সামরিক এবং আধাসামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহের জন্য যে বিশাল বাজার রয়েছে, স্থানীয় কৃষিজীবী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সরাসরি সেই সাপ্লাই চেনে যুক্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও এই রিজিওনের পরিকল্পনার মধ্যে রাখা যেতে পারে। এর ফলে ডুয়ার্স এবং তরাইয়ের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
এক উচ্চপদস্থ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাকর্তার বক্তব্য, ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওনের ধারণা কোনওভাবেই আলাদা রাজ্য বা স্বশাসিত অঞ্চলের বিতর্কিত দাবির সঙ্গে যুক্ত নয়। এটি সম্পূর্ণরূপে একটি জাতীয় সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক মাস্টার প্ল্যান। রাজনৈতিক তর্জা দূরে সরিয়ে রেখে জাতীয় স্বার্থে এই মডেলকে গ্রহণ করা কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় সরকারের জন্যই লাভজনক। এনএসআর-এর প্রস্তাবকে আর কালবিলম্ব না করে জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।’
