অরূপ দত্ত, কলকাতাঃ আগাগোড়া চড়া সুর। তৃণমূলকে কার্যত দেখে নেওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর মুখে। কখনও বলেছেন, সবকা সাথ সবকা বিকাশের সঙ্গে সবকা হিসাব লিয়া জায়েগা। কখনও ভাষণে শোনা গিয়েছে, বদলা কিংবা বিজেপি ক্ষমতায় এলে জেলে পাঠানোর হুমকি। যে ভঙ্গিতে সাধারণত বাংলার বিজেপি নেতারা ভাষণ দেন, তাতেই যেন সিলমোহর দিলেন নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi Brigade Rally)। লক্ষ্য? তাঁর ভাষায়, ‘নির্মম’ সরকার। তৃণমূল সরকারের পরিচয় দিতে বারবার নির্মম শব্দ ব্যবহার করেন মোদি।
২০১১ সালে বাংলার ক্ষমতা হাতে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্লোগান দিয়েছিলেন, বদলা নয়, বদল চাই। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বুঝিয়ে দিলেন, বিজেপি বাংলার শাসনদণ্ড হাতে নিলে ‘অপরাধীদের জায়গা হবে জেলে।’ সেই অপরাধীরা যে তৃণমূলের লোক, তার উল্লেখ কার্যত ছিল মোদির ভাষণের ছত্রে ছত্রে। তাঁর কথায়, ‘কোনও অত্যাচারীকেই ছাড়া হবে না। খুঁজে খুঁজে হিসাব নেওয়া হবে।’ কার্যত বদল ও বদলার কথাই ছিল ওই ভাষণে।
জবাবে তৃণমূলের এক্স হ্যান্ডেলে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘হুমকি, হিংসা, সংগঠিত দুষ্কর্মের পথেই কি তাহলে মোদিজি ক্ষমতা দখলে বিশ্বাসী?’ গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার প্রধানমন্ত্রী বাংলায় এলেও শনিবার ব্রিগেডে তাঁর ভাষণ ছিল অনেক চড়া সুরে বাঁধা। তিনি বলেন, ‘আমি তৃণমূলকে মনে করাচ্ছি, ওদের গুন্ডামির দিন এবার শেষ হওয়ার মুখে। তৃণমূল সরকারের যাওয়ার কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজেপি সরকার তৈরি হওয়ার পরে সকলের উন্নয়ন হবে একদিকে, অন্যদিকে সব কিছুর হিসাব হবে।’
তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘তৃণমূলের গুন্ডারা, যারা আপনাদের ভয় দেখায়, তাদের খারাপ দিন আসছে। আইনের শাসন হবে। অপরাধীদের একটাই জায়গা জেল… জেল।’ এই প্রসঙ্গে মোদি টেনে আনেন বাংলায় নারী সুরক্ষার প্রশ্ন। উদাহরণ টানেন সন্দেশখালির। তাঁর কথায়, ‘সন্দেশখালির সেই ছবি, আরজি করের ঘটনা মানুষ ভোলেনি। বাংলায় মেয়েদের বলতে হয়, বাড়ি ফিরে এসো সন্ধ্যা নামার আগে।’
প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই পরিস্থিতি বদলে যাবে। এটাই মোদির গ্যারান্টি। এবার তৃণমূলকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।’ ব্রিগেডে বিজেপির সভা শেষ হওয়ার আগে পালটা কলকাতায় শিল্পমন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে আক্রমণের অভিযোগকে হাতিয়ার করেছে তৃণমূল। ঘাড়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক বৈঠকে মোিদকে উদ্দেশ্য করে শশী প্রশ্ন করেন, ‘এটাই কি আপনার নারী সুরক্ষার গ্যারান্টি?’
মোদি অবশ্য বাংলায় জঙ্গলরাজ চলছে বলে মন্তব্য করে একের পর এক সমালোচনায় বিদ্ধ করেন তৃণমূলকে। তাঁর ভাষায়, ‘গদি বাঁচানোর জন্য এখানকার নির্মম সরকার সব হাতিয়ার বার করে ফেলেছে। আপনাদের আটকাতে গাড়ি থামিয়েছে। সেতু বন্ধ করেছে।’ তারপরই তিনি হুমকি দেন, ‘নির্মম সরকার, তোমরা কাউকে দমিয়ে রাখতে পারোনি। এবার যে আইন ভাঙবে, তাকে খুঁজে বার করা হবে।’
‘একটি কমিউনিটি একজোট হলে আপনাদের বারোটা বাজিয়ে দেবে’ বলে ক’দিন আগে ধর্মতলার ধর্না মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাকে অসুরক্ষিত করছে তৃণমূল সরকার। খোলাখুলি ধমক দেওয়া হচ্ছে, একটি সম্প্রদায় আপনাদের খতম করে দেবে।’ তাঁর ভাষায়, ‘সাংবিধানিক পদে বসে এমন কথা আপনার মুখে শোভা পায় না। ধমকানোই তৃণমূলের রাজনীতি। বাংলায় ভয়ের পরিবেশ বানিয়ে রাখা হচ্ছে।’
এরপর তিনি বলেন, ‘আমি জানতে চাই তারা কারা। যারা টিএমসি সরকারের ইশারায় কোটি কোটি লোককে খতম করবে?’ মোদি বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারীদের জন্য বাংলার রোটি, বেটি, মাটি সবচেয়ে বিপদে রয়েছে। এরা বাংলার রোজগার কেড়ে নিচ্ছে।’ ব্রিগেডের সভায় লোক ভালোই হয়েছে। পরোক্ষে সেই কথা মনে করিয়ে মোদির মুখে ছিল দলের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে পরিবর্তনের বার্তা।
যদিও তিনি সতর্ক করেন, ‘কিছু লোক আপনাকে ভয় দেখাতে চাইবে। বলবে বদল সম্ভব নয়। মনে রাখবেন জনতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা ইতিহাস বদলাবেই।’ তৃণমূলের কেন্দ্র বিরোধিতাকে ভোঁতা করতে তাঁর অভিযোগ, বিশ্বকর্মা যোজনা থেকে পিএম কিষান, আয়ুষ্মান ভারত, বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দিতে পিএম সূর্যঘরের মতো একাধিক কেন্দ্রীয় যোজনা স্রেফ মোদি বিরোধিতা করতেই রাজ্যে চালু করতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর কথায়, ‘এরা না নিজে করবে, না অন্যকে করতে দেবে।’
কলকাতার তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে দলের সাংসদ সায়নী ঘোষ পালটা বলেন, ‘বাংলার হকের ২ লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া। জল জীবন মিশন, আবাস যোজনার হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে রেখেছেন। এখন নির্বাচনের আগে ২ লক্ষ কোটির বদলে ১৮ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ললিপপ ধরাচ্ছেন।’ বুথে বুথে পৌঁছে নেতা-কর্মীদের মোদি প্রচার করতে বলেন, ‘টিএমসি গেলে তবেই গরিব মানুষ ঘর পাবে, চিকিৎসা পাবে, পানীয় জল পাবে। এটাই মোদির গ্যারান্টি।’
তৃণমূলের এসআইআর বিরোধিতার নিন্দা করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকা তৈরি করতে চাইছে বলে বাংলাজুড়ে তৃণমূল অরাজকতা সৃষ্টি করছে, প্রতিদিন হামলা করছে। এই অরাজকতাকে দিল্লিতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’ রাষ্ট্রপতিকে শিলিগুড়িতে অসম্মানকে তিনি তুলনা করেন গোটা আদিবাসী সমাজের অসম্মানের সঙ্গে।
