নাগরাকাটা: গত বছরের ৫ অক্টোবরের বিধ্বংসী বন্যার (Flood) স্মৃতি ফিরে এল নাগরাকাটায় (Nagrakata)। রবিবার গভীর রাতে আচমকাই সুখানী নদীর (Sukhani River) জল ফুলে উঠতে শুরু করে। নিমেষের মধ্যে তা প্লাবিত করে ব্লক সদরের বিভিন্ন এলাকা। জলমগ্ন হয়ে পড়ে বহু বাড়ি। জল ঢোকে নাগরাকাটা থানাতেও। আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসে বহু পরিবার। আগে থেকেই সুখানী নদীর ভাঙা বাঁধ নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়ে শোচনীয় দশা হয়। এলাকার অন্য নদীগুলিতেও জল বাড়লেও তাতে অবশ্য আশপাশের জনজীবনের ওপর মারাত্মক কোনও বিপর্যয় পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
এদিন সকালে নাগরাকাটার নদীগুলি পরিদর্শনে যান সেচ দপ্তরের কর্তারা। পরে মালবাজারে মহকুমা শাসকের দপ্তরের সেচ দপ্তর, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ ও বন দপ্তরের সাথে প্রশাসনের একটি বৈঠক হয়। নাগরাকাটার বিডিও জয়প্রকাশ মন্ডল বলেন, সুখানী, মূর্তি, ডায়না, জলঢাকার মত নদীগুলি ড্রেজিং এর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির প্রতি প্রশাসন সতর্ক নজর রেখে চলছে।
গত বছর ৫ অক্টোবর ভোরে নাগরাকাটা নজিরবিহীন প্লাবনের শিকার হয়। শনিবার গভীর রাতের এই ঘটনা সেই স্মৃতি খানিকটা ফিরিয়ে আনে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে। সুখানী নদীর জল উপচে ঢুকে পড়ে সুখানী বস্তী সহ বাবু পাড়া, বিজয় নগর এলাকায়। বহু বাড়ি জলমগ্নতার শিকার হয়। ভয়ে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান বহু মানুষ। বাকী রাত অনেকের রাস্তাতেই কাটে।
এদিন অরক্ষিত সুখানী নদীতে বাঁধ তৈরি, নদীর ধারে অবৈধভাবে তৈরি করা নির্মাণ ভেঙে ফেলা সহ একাধিক দাবিতে বিডিও অফিসে অবস্থানে সামিল হন বিজয় নগর, সুখানী বস্তীর একদল বাসিন্দা। সঞ্জীবন কুজুর নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমাদের এই দূর্ভোগ প্রতি বছরের। গত বার থেকে মাত্রাতিরিক্ত আকার ধারণ করেছে। কোথায় কী সমস্যা রয়েছে তা প্রশাসন ভালমত খতিয়ে দেখুক। নয়ত বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”
দুর্গামণি রায় নামে এক বৃদ্ধা রাতের পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তাঁর কথায়, “একা একটি কুঁড়ে ঘরে থাকি। আজ পর্যন্ত সরকারী বাড়িও পেলাম না। সেটাও বারবার জল ঢুকে থাকার অযোগ্য হয়ে উঠেছে। আমাদের মত মানুষকে দেখার কেউ নেই।” এডিশন ডেভিড কাছুয়া নামে বিজয় নগরের এক তরুণ বলেন, “আমাদের বাড়িতে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রও চলে। সেটির সব সামগ্রী নষ্ট হয়ে গিয়েছে।”
মলয় কর নামে সুখানী বস্তীর আরেক বাসিন্দার কথায়, “গত বছরের বন্যার ক্ষতিপূরণ বাবদ একটা টাকাও কেউ দেয়নি। তার ওপর আবার নতুন করে বিপর্যয় শুরু হল। এভাবে বেঁচে থাকাই দুষ্কর। সুখানী বস্তীর বলিরাম কুজুর নামে এক সমাজকর্মী বলেন, লাগোয়া সুখানী নদী যে এতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে কারও কল্পনাতেও ছিল না। বাঁধ বলে এখন আর সেখানে কিছু নেই। এরপর কি হবে ওপরওয়ালাই জানেন। বহু বাড়িতে এদিন হাঁড়ি চড়েনি।
রাতে আতঙ্ক ছড়ায় নাগরাকাটার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মহাদেব মোড়, ছওছড়িয়া মোড়, সুভাষ পল্লী এলাকাতেও। জল ঢুকতে শুরু করে ওই সব এলাকাতেও।এদিকে লাগাতার বৃষ্টিতে ময়নাগুড়ির রামশাই, আমগুড়ি ও চুরাভান্ডার গ্রাম পঞ্চায়েতের জলঢাকা নদী সংলগ্ন এলাকায় জল বাড়তে থাকে। গত বছরের ৫ অক্টোবর জলঢাকা নদীর বন্যায় আমগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের তারারবাড়ি ও খাটোরবাড়ি এলাকায় বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। পরবর্তিতে তা মেরামতও করা হয়েছিল। এদিন সেই বাঁধের কাছাকাছি জল চলে আসে। বাঁধ পেরিয়ে নদীর আশেপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িতে জল ওঠে। ময়নাগুড়ি থানার আইসি সুবল ঘোষ ও বিডিও সৌমেন দাস ওই বাঁধ পরিদর্শন করেন। নামানো হয় সিভিল ডিফেন্স কর্মীদের। এদিকে তিস্তা নদীর জল বাড়ার কারনে ময়নাগুড়ি ব্লকের পদমতি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার প্রায় ৫০টি বাড়িতে জল দাঁড়িয়ে যায়। নতুন করে বৃষ্টিপাত হলে তিস্তা ও জলঢাকা দুটি নদীতেই জল বাড়ার সম্ভাবনায় এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

