উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র যখন যুদ্ধের মেঘে আচ্ছন্ন, তখন ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক অকুতোভয় ভূমিকা পালন করছে ভারতীয় নৌবাহিনী। গাজা থেকে লেবানন—অস্থিরতার আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোতেও। এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে ‘এমভি সানসাইন’ (MV Sunshine) নামক একটি এলপিজি (LPG) পরিবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালী (Hormuz Strait) পার করে নিরাপদ জলসীমায় নিয়ে আসা হয়েছে।
‘এমভি সানসাইন’-এর এই নিরাপদ প্রত্যাবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সংশ্লিষ্ট মহলের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে পারস্য উপসাগরীয় এলাকা থেকে এই নিয়ে মোট ১৫টি ভারতমুখী এলপিজি জাহাজকে বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের মাধ্যমে বের করে আনা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়েই ভারতের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল ও এলপিজি-র সিংহভাগ পরিবাহিত হয়। বর্তমান অস্থিরতায় এই জলপথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় নৌবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে প্রতিটি জাহাজের ওপর ডিজিটাল ও শারীরিক নজরদারি চালাচ্ছে। সমুদ্রপথে ড্রোন হামলা, মাইন বা জলদস্যুতার মতো সম্ভাব্য প্রতিটি ঝুঁকি মোকাবিলায় নৌবাহিনীর (Indian Navy) যুদ্ধজাহাজগুলো সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে।
জ্বালানি সরবরাহের এই টানটান উত্তেজনার আবহে ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদির সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বুধবার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে কোনো পদক্ষেপ করবে না। গরিবাবাদি বলেন, “অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি আগের থেকেও অনেক বেশি নিরাপদ ও স্বচ্ছ হবে।” তবে একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার হস্তক্ষেপ এবং তাদের কূটনৈতিক অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছেন।
মজার বিষয় হলো, যেখানে ইরান পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ, সেখানে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা শোনা গিয়েছে তেহরানের কণ্ঠে। ব্রিকস (BRICS) রাষ্ট্রগোষ্ঠীর বিদেশমন্ত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের প্রাক্কালে গরিবাবাদি ভারতের ‘নিরপেক্ষতা’ ও ‘শান্তিকামী’ অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি সাফ জানান, ভারত সবসময়ই সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর পক্ষে। যদি ভারতের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলে শান্তি স্থাপনের জন্য কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে ইরান তাকে সানন্দে স্বাগত জানাবে।
ভারত ও ইরানের সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যিক লেনদেন বা তেলের আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের মন্ত্রীর ভাষায়, এই বন্ধন হাজার বছরের পুরনো সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে গাঁথা। তিনি উল্লেখ করেন, “ভারত ও ইরান ভৌগোলিকভাবে দুই দেশ হলেও মনস্তাত্ত্বিক ও সংস্কৃতিগতভাবে একে অপরের অত্যন্ত কাছাকাছি।” চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন থেকে শুরু করে কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের স্বার্থ জড়িত।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে রাশিয়ার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি সচল রাখা, অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা সামাল দিয়ে নিজেদের জ্বালানি ভাণ্ডার পূর্ণ রাখা। ‘এমভি সানসাইন’-এর সফল অপারেশন এটিই প্রমাণ করে যে, ভারত কেবল কূটনীতিতে নয়, সমুদ্রসীমায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষাতেও সমপরিমাণ দক্ষ। নৌবাহিনীর এই অতন্দ্র নজরদারি আর তেহরানের সাথে সুকৌশলী কূটনৈতিক সমঝোতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার চাকা সচল রয়েছে।
