স্বামীর সঙ্গে কৃষিকাজে, বিড়ি বেঁধেও সংসারের জোয়াল টানা যেত না। উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণে মাশরুম চাষ করে স্বনির্ভর বাতাসুরকুঠির বধূরা।
অমৃতা দে, দিনহাটা: সংসারে চরম আর্থিক অনটন। সেই সময়ে নিজেদের শখ-আহ্লাদ ভুলেই গিয়েছিলেন পাপিয়া মোদক, চন্দনা মোদক, রিঙ্কু মোদকের মতো গ্রামীণ বধূরা।
কেউ স্বামীর সঙ্গে কৃষিকাজ করতেন, কেউ বাড়ি বসে বিড়ি বেঁধে সামান্য আয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করতেন। তাতে নিত্যপ্রয়োজন, সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ত না। এমনই সময় তাঁদের জীবনে নতুন দিশা দেখায় মাশরুম চাষ (Mushroom Farming)। যা হাসি ফুটিয়েছে গ্রামের বধূদের মুখে।
দিনহাটা (Dinhata)-২ ব্লকের বামনহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের বাতাসুরকুঠি এলাকার এই বধূদের জীবনে পরিবর্তনের সূচনা হয় উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে তাঁদের মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন, নিজেদের বাড়িতে মাশরুম উৎপাদন করে পরিবারের খাদ্য-চাহিদা মেটানো যাবে। সেই লক্ষ্যে ছোট পরিসরে চাষ শুরু হয়। প্রথমদিকে প্রত্যেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি করে মাশরুমের সিলিন্ডার তৈরি করতেন। ঘরে ব্যবহারের পর যে সামান্য মাশরুম থেকে যেত, তা গ্রামের অন্যদের বিক্রি করতে শুরু করেন তাঁরা। এখান থেকে বদলাতে থাকে তাঁদের ভাবনা। মাশরুম বিক্রিতে বাড়তি আয় আরও উৎসাহিত করে তাঁদের। অল্প পুঁজি ও বাড়িতে বসে চাষের সুবিধা থাকায় তাঁরা বুঝতে পারেন, এই কাজকে বড় পরিসরে নিয়ে গেলে সংসারের হাল ধরা সম্ভব। এরপরই শুরু হয় পরিকল্পিত উদ্যোগ। বাতাসুরকুঠি গ্রামের প্রত্যেক মাশরুম চাষির বাড়িতে প্রায় এক হাজার থেকে দুই হাজার, কোথাও কোথাও তিন হাজার পর্যন্ত সিলিন্ডারে মাশরুম চাষ হচ্ছে। বছরে তাঁরা তিনবার মাশরুম উৎপাদন করেন। এভাবে গ্রামের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন মহিলা আজ মাশরুম চাষের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।
মাশরুমচাষি রিঙ্কু মোদক বলেন, একটি সিলিন্ডার তৈরি করতে খরচ পড়ে মাত্র ২৫ থেকে ২৮ টাকা। প্রতিটি সিলিন্ডার থেকে গড়ে প্রায় দেড় কেজি মাশরুম উৎপাদন হয়। বাজারে এই মাশরুমের দাম কেজি প্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। ফলে লাভের অঙ্কও নেহাত কম নয়।
মাশরুম বিক্রির জন্য তাঁদের আলাদা করে বাজারে যেতে হয় না। পাইকাররা সরাসরি গাড়ি এনে বাড়ির সামনে থেকেই মাশরুম সংগ্রহ করে নিয়ে যান।
পাপিয়া মোদক বলেন, ‘আগে বাড়ির রান্না ও সংসার সামলানোর পাশাপাশি স্বামীর সামান্য কৃষিকাজে সব খরচ চলত। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে দুশ্চিন্তা হত। এখন মাশরুম চাষ করে মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা রোজগার হচ্ছে। এতে পরিবারে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে।’ একই অভিজ্ঞতা চন্দনা মোদক ও অন্যান্য বধূর পরিবারেরও।
অল্প পুঁজি, সঠিক প্রশিক্ষণ ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি যে গ্রামীণ মহিলাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, বাতাসুরকুঠির এই মাশরুম চাষ তারই বাস্তব উদাহরণ। যা গ্রামের অর্থনীতির উন্নতিতে সমান ভূমিকা রাখে।
