পীড়িত রোগীর নার্সিংহোমে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে তাঁকে যেতে হয় হাসপাতালে। রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছোলে পরিজনের ভোগান্তির শেষ থাকে না। কোথাও রাতে থাকার বন্দোবস্ত নেই। কোথাও পরিজনের ওপর লাগামছাড়া জুলুম চলছে আয়াদের। বিপন্ন দুঃস্থ পরিজনের কাছে দাবি করা হচ্ছে হাজার টাকা। সরকার বদলালেও পরিস্থিতি বদলায়নি।
শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো ও নিরাপত্তা নিয়ে রাজ্যজুড়ে যতই চর্চা হোক না কেন, এমজেএন মেডিকেলের (MJNMCH) দশা সেই তিমিরেই। ‘মাতৃমা’ বিভাগে চিকিৎসাধীন রোগীর পরিজনদের থাকার জন্য এখনও ভরসা খোলা রাস্তা। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাসপাতাল রোডের উপরেই মশারি টাঙিয়ে রাত কাটাচ্ছেন রোগীর পরিজনেরা। পূর্বতন সরকারের আমলে ওই পরিজনদের জন্য পৃথক বিশ্রামাগার তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই কাজ আর বাস্তবায়িত হয়নি।
সরকার বদলানোর পর তিন মাস পেরিয়েছে। রোগীকল্যাণ সমিতির বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু সেই সমস্যা মেটেনি। মশারি টাঙিয়ে রাস্তার উপরে রাত কাটানো রোগীর পরিজনেরা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হাসপাতালেরই এক আধিকারিকের কথায়, ‘সেখানে রোগীর পরিজনদের থাকার ব্যবস্থা করার জন্য অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুত সমস্যা মেটানো হবে।’
কোচবিহারে মাঝেমধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। দিনদুয়েক আগের কথা। রাত দশটার দিকে এক মহিলাকে দেখা গেল মাতৃমা-র প্রবেশপথের পাশে রাস্তার ধারে মশারি টাঙাচ্ছেন। ততক্ষণে আশপাশে আরও বেশ কয়েকজন মশারি টাঙিয়ে তার ভিতরে বসে রয়েছেন। প্রত্যেকেরই রোগী ভর্তি রয়েছেন মাতৃমা-য়। সন্ধ্যার পর থেকেই আকাশের মুখ ভার। মাঝেমধ্যেই মেঘ ডাকছে। ওই রোগীর পরিজনদের তখন আর ভাগ্য সহায় হল না। মুহূর্তেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। মশারি গুটিয়ে তখন যে যেদিকে পারছেন, দৌড়োচ্ছেন। কেউ আশ্রয় নিলেন পাশের ওষুধের দোকানের সামনে শেডের নীচে। আবার কেউ প্রবেশপথের পাশে কোনওরকমে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঘণ্টাখানেক পর বৃষ্টি কমলে তখন আর রাস্তার উপর মশারি টাঙিয়ে শুয়ে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই।
এক রোগীর পরিজন কার্তিক সরকার বললেন, ‘মাতৃমা-র পাশে রোগীর পরিজনদের অপেক্ষা করার জন্য কোনও জায়গাই নেই। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তার উপরে থাকতে হচ্ছে। চারদিকে আবর্জনায় ভর্তি, মশার উৎপাত। তাই মশারি টাঙিয়ে রাস্তার উপরে থাকতে হয়।’ এক মহিলা সাবিত্রী দাসের বক্তব্য, ‘রোগীর কোনও প্রয়োজন হলে পরিবারের লোকেদের ডাকা হয়। তাই সবসময় মাতৃমা-র সামনেই থাকি। কিন্তু এখানে রাতে থাকার মতো কোনও জায়গা নেই। ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক না কেন, রাস্তার উপরেই থাকতে হয়।’
২০১৯ সালে এমজেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধীনে মাতৃমা তৈরি করা হয়। সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট, নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, এইচডিইউ, অপারেশন থিয়েটার সহ এই সম্পর্কিত সমস্ত ওয়ার্ডই একই ছাদের নীচে রয়েছে। অতিসংকটজনকদের জন্য পৃথক অবজারভেশন ওয়ার্ড মিলিয়ে মোট ২৯২টি বেড রয়েছে। সেখানে কমবেশি ১৫০-১৬০ জন চিকিৎসাধীন থাকেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, কর্পোরেট ধাঁচে তৈরি করা এই মাতৃমা উত্তরবঙ্গের যে কোনও বড় নার্সিংহোমকেও টেক্কা দিতে পারে। মাতৃমা তৈরির পর থেকে মাতৃকালীন মৃত্যুর হারও অনেকটাই কমেছে। ফলে জেলার অন্য মহকুমা ও আলিপুরদুয়ার থেকে প্রতিদিনই বহু রোগী আসেন। স্বাভাবিকভাবেই দূরের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে রোগীর জন্য অপেক্ষা করা নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, হাসপাতালের মূল ভবনের ভিতরে বিশ্রামাগার রয়েছে। সেখানে রোগীর পরিজনেরা থাকতে পারেন। তবে পরিজনেরা চাইছেন, মাতৃমা-র রোগীর পরিজনদের জন্য দ্রুত আলাদা বিশ্রামাগার তৈরি করা হোক।

