হরিশ্চন্দ্রপুর ও ধূপগুড়ি: স্মার্টফোনে সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) বিভিন্ন রিল স্ক্রল করতে করতে একটা জনপ্রিয় ডায়ালগ অনেকেই শুনেছেন। ‘অব করে তো করে ক্যায়া’। অনেকটা সেরকমই দশা বিভিন্ন স্কুলের মিড-ডে মিলের রাঁধুনিদের। তাঁরা কী করবেন, কীভাবে রাঁধবেন, ভেবেই পাচ্ছেন না। কারণ, কেন্দ্র সরকারের নির্দেশ মেনে স্কুলের মিড-ডে মিলে (Mid-day Meal Disaster) রান্নায় তেল এবং গ্যাসের ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দিল পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষা দপ্তর। রাজ্যের সমস্ত জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা আধিকারিকদের এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি পড়ুয়াদের পাতে।
তা যুদ্ধের জের তো সবাইকেই ভুগতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, সোনা না কিনতে, বিদেশ না যেতে। সরকার বলছে, ওয়ার্ক ফ্রম হোম করে জ্বালানি-বিদ্যুৎ ইত্যাদি সাশ্রয় করতে। স্কুল পড়ুয়াদেরও যে তার জ্বালা পোহাতে হবে, সে তো বলাই বাহুল্য। তবে মিড-ডে মিলের রান্নাবান্নার দায়িত্বে থাকা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের হিসেবটা খুব জটিল, আর বেশ গোলমেলে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্র পিছু ৬ টাকা ৭৮ পয়সা করে বরাদ্দ রয়েছে। আর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্র পিছু ১০ টাকা ১৭ পয়সা বরাদ্দ করা আছে। এই টাকার মধ্যে তরিতরকারি, ডিম, মশলাপাতি, রান্নার গ্যাস কিনতে হয় স্কুল কর্তৃপক্ষকে। অর্থাৎ, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া পিছু রান্নার তেল বরাদ্দ ৫ গ্রাম। এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মাথাপিছু রান্নার তেল বরাদ্দ সাড়ে ৭ গ্রাম। সেটাও এখন বাহুল্য। কমাতে হবে বলে নির্দেশ এসেছে। রাঁধুনিদের মাথায় হাত পড়াটাই স্বাভাবিক।
রাজ্যের কড়া নোটিশের পর এখন তো মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন শিক্ষকরা। তা বলে ক্ষোভের বহর কিন্তু কমছে না। হরিশ্চন্দ্রপুর (Harishchandrapur)-২ ব্লকের একটি স্কুলে শ-তিনেক পড়ুয়া রয়েছে। মিড-ডে মিলের মেনু তো নির্দিষ্টই। ভাত-ডাল, তার সঙ্গে কোনওদিন মিক্সড ভেজ, মানে সবজির ঘ্যাঁট। নাহলে ডিম। নয়তো সয়াবিন। আর কোনওদিন খিচুড়ি আর সবজি। নয়তো খিচুড়ি আর পাঁপড় ভাজা। সঙ্গে চাটনি। ট্যালটেলে সয়াবিনের তরকারি, ফ্যাকাশে সবজি আর খিচুড়ি নাহয় দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা সোনামুখ করে খেয়ে এসেছে এতদিন। এবার তার থেকেও তেলের পরিমাণ কমাতে হলে সবজি সেদ্ধ করে থালায় বেড়ে দিতে হয়, বলছিলেন সেই স্কুলের রান্নার মাসি। মিড-ডে মিল রান্নার কাজে নিযুক্ত হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মী অঞ্জলি মণ্ডল তো বলেই দিলেন, ‘পড়ুয়া পিছু যে তেল বরাদ্দ করা হয়েছে, তার মধ্যেই আমাদের রান্না করতে হয়। তাতে ভালো করে রান্না করাই মুশকিল। এর থেকে কম তেলে রান্না করব কী করে? সেটা করতে গেলে রান্নার কোনও স্বাদ থাকবে না। ছাত্রছাত্রীরাও খাবে কি না সন্দেহ।’
মালদা (Malda) জেলার আরেকটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সেই স্কুলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৮০০ জন ছাত্র মিড-ডে মিল খায়। প্রধান শিক্ষক বলছিলেন, ‘এখন তো গ্যাস মিলছে না। একেকটা সিলিন্ডার ১৮০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। সেই টাকাও কিন্তু ওই মিড-ডে মিলের বরাদ্দ থেকেই আসছে। আমাদের স্কুলে প্রতি মাসে ৬ থেকে ৮টা সিলিন্ডার খরচ হয়। এটা ন্যূনতম খরচ। আরও কী করে খরচ কমানো সম্ভব সেটা বুঝতে পারছি না।’
এবার ডুয়ার্সের একাধিক স্কুল রয়েছে, যেগুলি জঙ্গল লাগোয়া। সেসব স্কুলের কর্তৃপক্ষ যদি ভেবে থাকেন যে জঙ্গল থেকে শুকনো ডালপালা কুড়িয়ে নিয়ে এসে সেই কাঠের আঁচে রান্না করবে, সে গুড়ে বালি। কারণ, জঙ্গল রক্ষায় আবার বন দপ্তর সদা সতর্ক। জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে নিয়ে আসা চলবে না। জলপাইগুড়ির সুচন্দ্রা রায় নামে এক রাঁধুনি বলছিলেন, ‘একদিকে তেল পর্যাপ্ত দেওয়া হয় না। যা বরাদ্দ করা হয়, সেটাও কম। আর কাঠ আনতে দেবে না, গ্যাস আনার টাকা দেবে না, তাহলে জ্বালানি কোথা থেকে আসবে?’ শিক্ষা দপ্তরের কর্তারাও কোনও সমাধান দেখাতে পারছেন না। জলপাইগুড়ি জেলার বিদ্যালয় পরিদর্শক (প্রাথমিক) শ্যামল রায় কেবল বলেন, ‘যেভাবে নির্দেশ এসেছে, সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে।’
