মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়, লস অ্যাঞ্জেলেস: লস অ্যাঞ্জেলেসের বেভারলি হিলস বা হলিউডের স্টুডিওগুলোতে রোজ কতশত চিত্রনাট্য লেখা হয়! কিন্তু সিলিকন ভ্যালির ডেটা আর সম্ভাবনার অঙ্ক কষতে কষতে আমি বুঝতে পারছি, আসল ব্লকবাস্টার প্লট আজ দানা বাঁধছে ফুটবল মাঠের জ্যামিতিক বলয়ে। অ্যালগরিদম হয়তো আগে থেকে অনেক কিছুই বলে দিতে পারে, কিন্তু ফুটবলে যখন নস্টালজিয়া আর আবেগের ককটেল তৈরি হয়, তখন সব যান্ত্রিক হিসেবই ফিকে লাগে। এই মুহূর্তে বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) মঞ্চে এমন এক থ্রিলার তৈরি হচ্ছে, যা হলিউডের যে কোনও অস্কারজয়ী সিনেমাকেও অনায়াসে হার মানাবে। নকআউটের ব্র্যাকেট যদি ঠিকঠাক এগোয়, তবে শেষ আটের মঞ্চেই বিশ্ববাসী সাক্ষী হতে পারে এক মহাকাব্যিক ক্লাইম্যাক্সের। একদিকে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর (Messi Vs Ronaldo) পর্তুগাল (Argentina Vs Portugal) !
ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ দুই মহাতারকা, যাঁরা গত দেড় দশক ধরে ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্যবার একে অপরের বিরুদ্ধে জাদুকরি দ্বৈরথে মেতেছেন, তাঁরা আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনও মুখোমুখি হননি। শেষবার এই দুই কিংবদন্তি একই মাঠে খেলেছিলেন এক প্রদর্শনী ম্যাচে, যেখানে মেসির প্যারিস সাঁ জাঁ মুখোমুখি হয়েছিল আল হিলাল এবং আল নাসেরের সম্মিলিত দলের বিরুদ্ধে। ৫-৪ গোলে পিএসজি-র জেতা সেই ম্যাচে দুজনেই গোল করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট তো আর কোনও প্রীতি ম্যাচ নয়, এ হল ডু-অর-ডাই অ্যাকশন সিকোয়েন্স।
বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুজনেই এখন স্বপ্নের ফর্মে, ঠিক যেন হলিউডি পর্দার কোনও চিরসবুজ নায়ক। আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক আর অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে মেসি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ম্যাজিক তাঁর পায়ে এখনও অটুট। অন্যদিকে, কঙ্গোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে কিছুটা নিষ্প্রভ থাকলেও, উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে নিজের চেনা মেজাজে ফিরেছেন রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldon)। দুই তারকাই এখন যেন শেষ আটের সেই স্বপ্নের লড়াইয়ের জন্য নিজেদের শানিয়ে নিচ্ছেন।
কিন্তু এই মায়াবী দ্বৈরথে পৌঁছানোর চিত্রনাট্যের অঙ্কটা ঠিক কীরকম? আলজিরিয়া ও অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যেই গ্রুপ ‘জে’-র শীর্ষে। রবিবার জর্ডনের বিরুদ্ধে যাই ফলাফল হোক, তারা গ্রুপ সেরা হয়ে রাউন্ড অফ ৩২-এ সামনে পাবে কেপ ভের্দেকে। সেই হার্ডল পেরোলে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে তাঁদের মুখোমুখি হতে হবে অস্ট্রেলিয়া বনাম মিশর ম্যাচের বিজয়ীর সঙ্গে। সেই ম্যাচ জিতলেই কোয়ার্টার ফাইনালের রেড কার্পেট বিছানো থাকবে আর্জেন্টিনার জন্য।
অন্যদিকে, এই স্বপ্নের মহারণ বাস্তবায়িত করতে রোনাল্ডোর পর্তুগালকেও নিজেদের গ্রুপের শীর্ষে থাকতে হবে। তার জন্য রবিবার শেষ গ্রুপ ম্যাচে তাদের হারাতে হবে কলম্বিয়াকে। সেই ম্যাচ জিতলে রাউন্ড অফ ৩২-এ পর্তুগালের সামনে পড়বে ডি, ই, আই, জে অথবা এল গ্রুপের তৃতীয় স্থানাধিকারী কোনও দল। এরপর প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে তারা মুখোমুখি হতে পারে সুইৎজারল্যান্ডের। এই সমস্ত বাধা যদি সিআরসেভেন পেরোতে পারেন, তবেই শেষ আটের মঞ্চে তৈরি হবে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
লস অ্যাঞ্জেলেসের আকাশে বাতাসে এখন শুধুই সেই প্রত্যাশার পারদ চড়ছে। হলিউডের বিখ্যাত পাহাড়ের সাইনটার মতোই এই সম্ভাব্য মহারণের উন্মাদনা এখন সবার মুখে মুখে। সিলিকন ভ্যালির কোনও যন্ত্র হয়তো এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে এই লড়াই সত্যিই হবে কি না। কিন্তু অঙ্কের হিসেব আর সম্ভাবনার সমীকরণ যদি মিলে যায়, তবে এই আমেরিকার মাটিতেই লেখা হবে ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্লকবাস্টার অধ্যায়টি।

