শুভদীপ শর্মা, ময়নাগুড়ি: ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ময়নাগুড়িতে। শহরের বাজার লাগোয়া রাউত কলোনি থেকে ওভারব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে যত দূর নজর যায়, শুধু নির্মাণ আর নির্মাণ। কোথাও নির্মাণ শেষ হয়ে গিয়েছে, কোথাও নির্মাণকাজ চলছে পুরোদমে। যেন ময়নাগুড়ি (Maynaguri) শহরের নতুন একটি অংশের জন্ম হতে চলেছে।
এজন্য জমি কেনার হিড়িক এখন ময়নাগুড়িতে। মূলত স্থানীয় ব্যবসায়ী, দোকানদাররা জমি কেনায় ব্যস্ত। কেউ কেউ জমি কিনে দোকান তৈরি করে ফেলেছেন। কেউ দোকান তৈরি করে ভাড়াও দিয়ে রেখেছেন। ভাড়া দোকানের খোঁজে অনেকে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। শহরের ওপর দিয়ে ৭১২ নম্বর জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পে চোখে সর্ষেফুল দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
ওই প্রকল্পে শুধু ময়নাগুড়ি শহরেই ৬০০-র বেশি ব্যবসায়ী উচ্ছেদ হবেন। প্রশাসন বা জেলা পরিষদ কিংবা পুরসভা পুনর্বাসনের কোনও পরিকল্পনা না করায় ব্যবসায়ীরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করার জন্য এখন মরিয়া। এই হুড়োহুড়িতে হুহু করে বাড়ছে জমির দাম। কোথাও কোথাও দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি। যে জমি তিন থেকে চার লাখ টাকা প্রতি ডেসিমালে পাওয়া যেত, এখন তার দাম ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা ডেসিমাল।
ময়নাগুড়ি পাওয়ার হাউস মোড়ের পাশে ছোট্ট স্টেশনারি দোকানের মালিক চার নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা উত্তম সরকার বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে রাস্তার পাশে দোকানদারি করছি। ভাবিনি রাস্তা চওড়া হবে। এখন জমির যা দাম হয়েছে, তাতে রাস্তা সম্প্রসারণে উচ্ছেদ হতে হলে কী করে রুজিরুটি চালাব, ভেবে রাতের ঘুম উবে গিয়েছে।’ জাগৃতি মোড়ের পাশে টোটোর বিভিন্ন সামগ্রীর দোকানদার নয়ন বিশ্বাস বলেন, ‘রাস্তা সম্প্রসারণে উচ্ছেদ হতে হবে জেনে সমস্ত জমানো টাকা দিয়ে রাউত কলোনিতে নিজের দোকানঘর তৈরি করে নিয়েছি।’
যদিও ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান মনোজ রায়ের বক্তব্য, অবৈধ নির্মাণ চোখে পড়লেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভাইস চেয়ারম্যান ঝুলন সান্যাল জানান, নিয়ম না মেনে গড়ে ওঠা বেশকিছু নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। বাস্তব কিন্তু এই দাবির সঙ্গে মেলে না। একদিকে যেমন খুশি জমি কেনায় দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইকে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে যথেচ্ছ নির্মাণে এমনিতেই যানজট সমস্যায় জর্জড়িত ময়নাগুড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার মেঘ ঘনাচ্ছে।
ইতিমধ্যে নির্মাণ করা দোকানঘর চড়া দামে ভাড়া দিয়ে ফেলছেন অনেকে। অনেকে পরে আর ঘর নাও পাওয়া যেতে পারে ভয়ে ভাড়া নিয়ে দোকান শুরু না করলেও মাসে মাসে টাকা গুনে যাচ্ছেন। পাওয়ার হাউস সংলগ্ন এলাকার হেমন্ত রায় বছর দুয়েক আগে নিজের জমিতে পাঁচটি দোকানঘর তৈরি করেছিলেন। সবক’টিই ভাড়া হয়ে গিয়েছে।
হেমন্ত বলেন, ‘আমার আরও কিছু জমি আছে। প্রায়দিনই লোক এসে সেগুলো বিক্রি করব কি না জানতে চাইছে। জমি না কিনলেও অনেকে ফাঁকা জমিতে ঘর তৈরি করে দিতে বলছেন। ওঁরা ভাড়া চান।’ সময় বুঝে যে তিনি ওই জমির সদ্ব্যবহার করতে তৈরি, তা বুঝিয়ে দিলেন।
জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের সভাধিপতি কৃষ্ণা রায় বর্মন বলছেন অবশ্য, ‘উন্নয়নের জন্য কাউকে উচ্ছেদ হতে হলে রাজ্য সরকার অবশ্যই তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। ময়নাগুড়ি শহরের জেলা পরিষদের অনেক জায়গা রয়েছে। পুনর্বাসনে সেগুলিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে।’
কিন্তু সরকারি তরফে পরিকল্পনার আভাস না পেয়ে ব্যবসায়ীদের তড়িঘড়ি জমি কিনে নির্মাণে অপরিকল্পিত শহর তৈরি হচ্ছে। কোথাও খাল-বিল, আবার কোথাও নিকাশিনালা বুজিয়ে একের পর এক নির্মাণ হচ্ছে। একদিকে উন্নয়নের স্বার্থে রাস্তা সম্প্রসারণ, অপরদিকে ব্যবসায়ীদের জীবিকার তাগিদে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিতভাবে এই নির্মাণ আগামীদিনে ময়নাগুড়ি শহরের জন্য বিপদ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
হয়তো কোথাও নিকাশির ব্যবস্থা থাকবে না, সব জায়গায় পানীয় জলের জোগান নাও থাকতে পারে। ঘিঞ্জি এলাকা হয়ে গেলে যানজটের সমস্যা বাড়তে পারে।
