বুল নমদাস, নয়ারহাট: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নলঙ্গিবাড়ির বাসিন্দা পরিতোষ বসুনিয়া, মাথাভাঙ্গা কলেজে পড়াকালীন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হন। তৃণমূল নেতা নজরুল হকের হাত ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ পরিতোষের। তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা পরিতোষ ২০০০-২০১৮ সালের মধ্যে প্রায় ১৫ বছর তৃণমূলের শিকারপুর অঞ্চল কমিটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরিতোষ ২০১৩-২০১৮ সাল পর্যন্ত শিকারপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন। ব্লক (মাথাভাঙ্গা-১) রাজনীতিতেও (Mathabhanga) পরিচিত মুখ ছিলেন পরিতোষ। একসময়ের এই দাপুটে নেতার বর্তমানে দলে কোনও পদ নেই। অঞ্চল দূর অস্ত, নিজের বুথেও দলের কোনও কর্মসূচিতে এখন ডাক পান না বছর সাতচল্লিশের পরিতোষ। এই নিয়ে তাঁর যথেষ্ট আক্ষেপ ও অনুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বামফ্রন্ট এবং সিপিএমের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে। ক্ষমতায় আসার আগে থেকে আমরা নিঃস্বার্থভাবে দলের সঙ্গে থেকেছি। অনেক প্রতিকূলতা, অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েও দলের হয়ে মিটিং-মিছিল করেছি। কিন্তু দল ক্ষমতায় আসার পর আমরা পুরোনোরাই ব্রাত্য হয়ে গেলাম।’ তিনি যোগ করেন, ‘এখন দলের ভালো সময়। তাই অনেকেই দলে ভিড়েছেন। মাথাভাঙ্গা-১ ব্লক এলাকায় তো অনেক প্রাক্তন সিপিএম নেতা রং বদলে তৃণমূলের পতাকা ধরেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে তো আবার তৃণমূলের ব্লক স্তরের নেতাও হয়েছেন। আর পরিস্থিতি পালটে যাওয়ায় আমরা, দলের পুরোনো সৈনিকরা ব্রাত্য হয়েছি।’
তৃণমূল নেতা নজরুলের প্রভাবেই পরিতোষ রাজনীতির ময়দানে নামেন। নজরুলের ঘনিষ্ঠ মহলে অবাধ যাতায়াত ছিল পরিতোষের। ২০১৮ সাল পর্যন্ত শিকারপুরে তৃণমূল রাজনীতিতে পরিতোষের যথেষ্ট ‘দাপট’ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের শাসকদলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলায়। এর জেরে ব্লক রাজনীতিতে নজরুলের আধিপত্য কমে। নজরুলের ঘনিষ্ঠ হওয়ার খেসারত দিতে হয় পরিতোষকে। শিকারপুরে পরিতোষের গুরুত্ব কমে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শীতলকুচি আসনে পার্থপ্রতিম রায় প্রার্থী হওয়ার সময় কিছুদিন পরিতোষকে দলের বিভিন্ন কাজে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ভোটের পর থেকেই পরিতোষের ওপর থেকে স্পটলাইট সরে যায়। শাসকদলের ‘রাডার’-এর বাইরে চলে যান তিনি। আর এখন তো নিজের বুথেও দলের কোনও কর্মসূচিতে তাঁকে ডাকা হয় না। এক সময়ের ব্যস্ত নেতা এখন আলুর ব্যবসায় মন দিয়েছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, শুধু শিকারপুর নয়, ব্লকের অন্য গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিতেও অনেক পুরোনো নেতাকে ‘বসিয়ে’ রাখা হয়েছে। দলের দুর্দিনে ময়দানে থাকা নেতাদের দল যোগ্য সম্মান দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন পরিতোষ। দলের কোনও কর্মসূচিতেই পুরোনোদের ডাকা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি। এভাবে চলতে থাকলে সামনের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভোটবাক্সে এর প্রভাব পড়বে বলে পরিতোষের ধারণা। তিনি বলেন, ‘যে দলের (সিপিএম) বিরুদ্ধে লড়াই, আন্দোলন করেছিলাম, সেই দলের পুরোনো নেতারাই যদি দল পালটে তৃণমূলে এসে নেতা হয়ে যান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পুরোনোদের আর মর্যাদা দেওয়া হবে না। অন্য দল থেকে আসা নেতারা প্রতিহিংসার বশে আমার মতো দলের অনেক পুরোনো কর্মীকে ব্রাত্য করে রাখছেন।’
এই বিষয়ে তৃণমূলের শিকারপুর অঞ্চল কমিটির সভাপতি নিত্যজিৎ বর্মন কোনও মন্তব্য করতে চাননি। যদিও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃণমূল নেতার দাবি, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটে দলবিরোধী কাজ করার জন্যই দলের কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারান একসময়ের দাপুটে নেতা পরিতোষ।
