মানুষ না হয় নির্দিষ্ট সময় মেনে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার করে। কিন্তু পায়রারা? তাদের কি খাওয়ার এইরকম নির্দিষ্ট কোনও সময় রয়েছে? আর কোথাও না থাকুক, মালদার পায়রাদের রয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় সকাল আটটা, দুপুর বারোটা এবং বিকেল চারটে বাজলেই তারা জানে খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। এইসবের পেছনে রয়েছেন একজন মানুষ, অমিতকুমার গুপ্তা। কীভাবে? লিখলেন কল্লোল মজুমদার।
মালদা: শীতের সকাল। ঘড়িতে তখন ঠিক সকাল আটটা। বালতি হাতে লোহার সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেলেন বছর ৪৫-এর এক যুবক। বালতি ভর্তি গম। সেই গম ছাদে ছিটাতে ছিটাতে ওই তরুণ ডাকতে থাকেন, ‘জয়া, সোনি… আয়… আয়…।’ সেই ডাক শুনে ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা এদিক-ওদিক থেকে উড়ে এসে বসে পড়ে ছাদে, আর খুটেখুটে খায় সেই গম। জয়া, সোনির মতো কয়েকটা পায়রা আছে যেগুলো এসে বসে পড়ে ওই তরুণের গায়ে। একটা-দুটো নয় হাজার দেড়েক পায়রাকে এভাবেই প্রতিদিন খাওয়ান ওই তরুণ, নাম অমিতকুমার গুপ্তা। আর সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দাঁড়িয়ে পড়েন পথচলতি মানুষেরা।
মালদা শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র নেতাজি মোড়। সেখানেই রয়েছে মালদা অ্যাসোসিয়েট ক্লাব। আর ক্লাব প্রাঙ্গণে রয়েছে জগদ্ধাত্রী মন্দির। মন্দিরের পেছনে রয়েছে ক্লাবঘর। সেই ক্লাবের কাজকর্ম দেখাশোনা করেন অমিত। বলা যেতে পারে তিনি ওই ক্লাবের একপ্রকার কেয়ারটেকারই। তবে তাঁর এই অভ্যাস ১-২ বছরের নয়, বরং ১৫-২০ বছরের।
অমিতের বাড়ি মালদা শহরের দক্ষিণ বালুচরে। দিনে তিনবার তিনি এমনভাবেই হাজারো পায়রার খাবারের জোগান দেন। ঘড়িতে সকাল আটটা, দুপুর বারোটা আর বিকেল চারটা বাজলেই পায়রাগুলো বুঝে যায় এবার তাদের খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। কোনও সময় দেওয়া হয় গম, কোনও সময় সর্ষে। যে যেখান থেকে পারে উড়ে এসে ভিড় জমায় মন্দিরের ছাদে, আশপাশের অফিস, ব্যবসাকেন্দ্রের মাথায়। আর অমিতের ‘আয়… আয়…’ ডাক শুনলেই নেমে আসে খাবারের জন্য।
অমিতের কথায়, ‘আমাদের ক্লাবের কর্ণধার রতন আগরওয়াল গম কেনার টাকা দেন। সেই টাকায় বছরের পর বছর ধরে গম কিনে নিয়ে এসে আমি পায়রাগুলোকে খাওয়াই।’ কত পায়রা আছে? প্রশ্নের উত্তরে অমিত জানান, দেড় হাজার তো বটেই। সেইসঙ্গে তাঁর আরও সংযোজন, ‘একসময় কিছু কিছু পায়রা ছিল যেগুলো ঘাড়ে করে আমার বাড়ি চলে যেত। আবার ফিরে আসার সময় কাঁধে চেপেই ক্লাবে চলে আসত। ওই পায়রা দুটো মরে গিয়েছে। বিড়াল খেয়ে নিয়েছে।’
এখানে আরও আশ্চর্যের বিষয়, অমিত খেতে না দিলে পায়রাগুলো দিনের পর দিন না খেয়ে থাকে। অমিতের কথায়, ‘আমি কোনও কারণে না আসতে পারলে যদি অন্য কেউ খেতে দেয় তবে কিছুতেই খায় না পায়রাগুলো।’ শুধু তাই নয়, অমিতের সঙ্গে অন্য কেউ খাবার দিতে এলে সেই খাবারও মুখে তোলে না পায়রার দল। এই ক্লাবের সদস্য তপনকুমার দাসের মন্তব্য, ‘পায়রার খাবারের জন্য প্রতিদিন অনেক টাকা খরচ হয়। বাজার থেকে সবচেয়ে ভালো গম, সবচেয়ে ভালো সর্ষে কিনে নিয়ে আসা হয়। পুরো টাকাই খরচ করেন আমাদের ক্লাবের কর্ণধার রতন আগরওয়াল।’
বৃহস্পতিবার সকালে পায়রার খাওয়া দেখতে দেখতে সেই দৃশ্যকে ক্যামেরাবন্দি করেন পথচলতি অসীম হালদার। তাঁর মন্তব্য, ‘এ দৃশ্য শুধু ক্যামেরাবন্দি নয়, মনবন্দি করে রাখলাম। যে স্মৃতি মনের মধ্যে গেঁথে থাকবে দীর্ঘদিন।’
