এম আনওয়ারউল হক, বৈষ্ণবনগর: উত্তরবঙ্গের আবেগে জড়িয়ে থাকা গঙ্গা আজ যেন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে মালদার (Malda) বৈষ্ণবনগরের (Baishnabnagar) মানুষের কাছে। টানা কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা অস্বাভাবিক জলের স্রোত গঙ্গাকে করেছে ভয়ংকর। বিপদসীমা ছুঁইছুঁই জলস্তর, নদীর ভাঙন গ্রাস করছে একের পর এক গ্রাম। বিশ্বকর্মাপুজোর দিন থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে যেন বিরতি নেই। গঙ্গা গ্রাস করেছে কালিয়াচক ৩ নম্বর ব্লকের লক্ষ্মীপুর ও বীরনগর–২ গ্রাম পঞ্চায়েত। বসতবাড়ি, ফসলি জমি, গবাদিপশু, এমনকি গ্রামীণ রাস্তাঘাটও চলে গিয়েছে নদীগর্ভে। যে কারণে রাত শুরু হলে বাড়ছে আতঙ্ক। অসংখ্য পরিবার ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে দিশেহারা অবস্থায় পালাচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। ভাঙন প্রতিরোধের টাকা কোথায় যায়, অজানা সকলের।
অস্থায়ী বালির বস্তা বা খণ্ডকালীন বাঁধ দিয়ে গঙ্গার ভাঙন ঠেকানো যাবে না, স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘকালীন পরিকল্পনায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। অন্যথায় যে উত্তরবঙ্গের মানচিত্র থেকে একে একে হারিয়ে যাবে বহু গ্রাম, পরিষ্কার করে দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে আলোচনা হয়। হয় একের পর এক বৈঠক। ‘পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে’, ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে দেয় সেচ দপ্তর। কিন্তু বর্ষা শেষে সমস্ত পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যায় যেন গঙ্গার জলেই। আর বর্ষার বাস্তবতা হল, প্রতিদিনই নতুন নতুন জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তার গঙ্গাগর্ভে চলে যাওয়া। হাজারো পরিবার আজ দিশেহারা। কেউ ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, কারও চোখে ভয় ও জল। জীবনের অংশ হয়ে ওঠা গঙ্গাই আজ ছিনিয়ে নিচ্ছে বেঁচে থাকার ভরসা।
পেশায় কৃষক পার অনন্তপুরের রবীন্দ্রনাথ হালদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘কতবার সেচ দপ্তরে দৌড়েছি, কত আবেদন করেছি, গুনে শেষ হবে না। নদী ভাঙছে, ঘর ভাঙছে, ফসল নষ্ট হচ্ছে। অথচ প্রশাসন শুধু ছবি তোলে, রিপোর্ট বানায়। আমাদের বাঁচানোর মতো কোনও কাজ করে না।’ ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম বীরনগর–২’এর বাসিন্দা আজিজুল শেখ প্রান্তিক চাষি। চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘আমাদের সব চাষের জমি গঙ্গাগ্রাসে। বাপ-ঠাকুরদার পরিশ্রমে গড়ে তোলা যা কিছু ছিল, কয়েকদিনেই শেষ। যদি এখনই বাঁধ না হয়, পুরো গ্রামটাই ডুবে যাবে।’ চিনা বাজারের গৃহবধূ বেবি খাতুন বুক চাপড়ে কেঁদে বলেন, ‘ঘর ভেঙে গিয়েছে। ছোট ছেলেটা অসুস্থ, কোথায় নিয়ে যাব বুঝতে পারছি না। প্রতি বছরই ভাঙনের ভয় নিয়ে বাঁচি। এবার সব শেষ।’ এই গ্রামেরই তরুণ ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, ‘একটা ছোট দোকান ছিল। দিন আনি দিন খাই করে সংসার চালাতাম। নদী সেই দোকানটাও গিলে নিল। এখন পরিবারকে খাওয়াব কীভাবে? আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।’
এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতেই শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে বৈষ্ণবনগরের বিধায়ক চন্দনা সরকার পা রাখলে তাঁকে ঘিরে ক্ষুব্ধ মানুষ বিক্ষোভ দেখান। অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে গঙ্গার ভাঙন চললেও প্রশাসন শুধু আশ্বাস দিয়েছে, স্থায়ী সমাধান হয়নি। বিধায়ক অবশ্য বলছেন, ‘প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস মিলেছে।’ কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্য, প্রতি বছরই একই কথা শোনা যায়। কিন্তু কাজ কিছুই হয় না।
