সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর: প্রতিবছরের মতো এবছরও ২১ ফুটের বুড়িমা’র পুজো দেখতে ভিড় জমিয়েছেন পাশাপাশি দুই রাজ্যের মানুষ। দীর্ঘ ৩০০ বছর ধরে বড়ই গ্রাম পঞ্চায়েতের মোবারকপুর কালীতলায় এই পুজো হচ্ছে। এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন মালদার (Malda) চাঁচোলের (Chanchal) এক রাজা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মোবারকপুরের কালী, লস্করপুরের কালী এবং চাঁচল বত্রিশকোলার কালী তিন বোন। এই তিন বোনের মধ্যে বড় বোন হলেন এই মোবারকপুরের বুড়িমা।
স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, প্রতিবছর এখানে কালীপুজোর পরের দিন থেকে মেলা শুরু হয়। বাংলা ও বিহার সীমানাবর্তী এলাকায় মোবারকপুর অবস্থিত হওয়ায় এই বুড়িমায়ের পুজোকে কেন্দ্র করে বসা মেলায় বাংলা ছাড়াও বিহারের বহু পুণ্যার্থী প্রতিবছর অংশগ্রহণ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ঝুমা সাহা বলেন, ‘পুরানো নিয়ম মেনে দেবী প্রতিমা বেদির পাশে তৈরি করা হয়। পুজোর রাতে পাঁঠাবলি দেওয়ার রীতি আজও রয়েছে। বিসর্জনের আগে জোড়া পায়রা বলি দিয়ে তার রক্ত দেবীর জিভে দেওয়া হয়। তারপর রাত পোহাতেই শুরু হয় মেলা। সারারাত ধরে চলে গানের আসর।’
স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য নিকুঞ্জকুমার সাহা জানান, এখানে দেবী বুড়িমা কালী নামে পরিচিত। এই প্রতিমার সঙ্গে মিল রয়েছে চাঁচলের বত্রিশকোলা ও রতুয়ার লস্করপুরের কালীমূর্তির। তিনি আরও জানান, ঐতিহ্য মেনে আজও কালীপুজোর দিন দেবীমূর্তিতে রং করা হয়। পুজোর সময় দেবীকে বেদিতে স্থাপন করা হয়। পুজো চলে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে। এখানে মায়ের মূর্তিতে ৫ ফুট উচ্চতার ও আড়াই কেজি ওজনের রুপোর মুকুট পরানো হয়। দেবীর হাতে দেড় কেজির রুপোর খাঁড়া শোভা পায়।
পাশেই রয়েছে মরা মহানন্দা নদী। এখানে মায়ের মূর্তি বিসর্জন দেওয়া হয়। পুজোর পরদিন থেকে চারদিন ধরে মেলা চলে। এই এলাকার অনেকে বাইরে কাজ করেন। তাঁরা দুর্গাপুজোয় বাড়ি ফিরতে না পারলেও কালীপুজোয় বাড়ি আসেন। এই মেলায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ হাজির হন। তাই এই মেলাটি আজও এলাকায় সম্প্রীতির ছবি ফুটিয়ে তোলে।
এই পুজো কমিটির সম্পাদক নিত্যগোপাল সাহা বলেন, ‘মায়ের পুজো হয় স্থায়ী বেদিতে। এতদিন খোলা আকাশের নীচে পুজো হত। মাথার ওপর থাকত একটি চাঁদোয়া। তবে গত বছর থেকে মাথার উপর পাকা ছাদ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু চারদিক এখনও খোলা রয়েছে।’
পুজো কমিটির সভাপতি অরণ্য সাহার কথায়, ‘এই বেদিকে ঘিরে বহু বছর আগে একবার মন্দির তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। দেবী স্বপ্নাদেশে জানিয়ে দেন যে, খোলা আকাশের নীচে পুজো করতে হবে যাতে দূর থেকেও ভক্তরা তাঁকে দেখতে পান। তারপর আর মন্দির তৈরির চেষ্টা করা হয়নি। তবে বছর দুয়েক আগে দেবী ফের স্বপ্নাদেশে জানান যে ঘেরা মন্দির নয়, তবে চারদিক খোলা রেখে মাথায় ছাদ তৈরি করা যেতে পারে। তাই শুধু ছাদটি তৈরি করা হয়েছে।’
