জসিমুদ্দিন আহম্মদ, মালদা: বাংলায় দেবীর দক্ষিণাকালী রূপটি সবথেকে বেশি জনপ্রিয় হলেও তন্ত্র মতে দেবী কালিকা হলেন ‘অষ্টধা’। অর্থাৎ দেবীর আটটি রূপ। দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, শ্রীকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও মহাকালী। মালদা শহরের (Malda) গঙ্গাবাগে এই মহাকালীরই আরাধনা এককালে করতেন দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা একদল তরুণ বিপ্লবী।
প্রায় শতবর্ষ ছুঁইছুঁই করছে গঙ্গাবাগ ইংরেজবাজার ব্যায়াম সমিতির দশমাথার মহাকালীপুজো (Kali Puja 2025) এখানে কালীপুজোর দায়িত্বে রয়েছেন শুভ্রাংশু, প্রশান্ত, শান্তনুরা। তাঁদের সঙ্গে দায়িত্বে রয়েছেন সাব্বির, কুরবান, হাসান আলিরাও। এখানে কালী চতুর্ভুজা নয়, দশভুজারূপে পূজিতা হন। কারণ দেবীর ১০টি মাথা ও ১০টি হাত। তবে মূর্তিতে মহাদেবের কোনও অস্তিত্ব নেই। এখানে অমাবস্যার রাতের বদলে দিনের আলোয় পুজোর রেওয়াজ রয়েছে। ইতিমধ্যেই পুজোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে।
১৯৩০ সালে এই পুজো শুরু করেন তৎকালীন মালদা শহরের পুড়াটুলি এলাকার বেশ কিছু তরুণ৷ তাঁদের চোখে তখন দেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন৷ নিজেদের মানসিক ও শারীরিকভাবে শক্তিশালী করতে তাঁরা একটি ব্যায়ামাগার খোলেন৷ তার নাম দেন ইংরেজবাজার ব্যায়াম সমিতি৷ দেশকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্য সফল করতে তাঁরা মায়ের আরাধনা শুরু করেন। মালদা থেকে সামান্য দূরেই বিহারের বিন্দুবাসিনী পাহাড়৷ সেই পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা রয়েছে মহাকালীর মূর্তি৷ ওই তরুণরা সেই মূর্তিকে নিজেদের আরাধ্যা দেবী হিসাবে বেছে নেন৷
মহাদেবের দেহে পা রেখে দেবীর লজ্জায় রাঙা মুখের পরিবর্তে তাঁরা দেবীর অসুর সংহারী রূপকেই বেছে নিয়েছিলেন। ওই স্বাধীনতা সংগ্রামী তরুণের দলটি হয়তো ব্রিটিশদের অসুরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন৷ সেই সময় অমাবস্যার রাতে ইংরেজরা পুজো করতে না দেওয়ায় চতুর্দশী তিথিতে দিনের বেলা তাঁরা মায়ের আরাধনা শুরু করেন। প্রথমে পুড়াটুলি এলাকায় এই পুজোর প্রবর্তন হলেও সময়ের সঙ্গে পুজোর জায়গা কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছে৷ শেষপর্যন্ত ১৯৮৫ সালে মালদা শহরের গঙ্গাবাগ এলাকায় পাকাপাকিভাবে এই পুজো সরে আসে৷
একসময় গঙ্গাবাগের বাসিন্দা ছিলেন প্রখ্যাত তান্ত্রিক প্রফুল্লধন মুখোপাধ্যায়৷ তখন এই এলাকাটি জঙ্গলে ভরা ছিল। সাধনার জন্য সেখানে তিনি পঞ্চমুণ্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ ১৯৮৫ সালে সেই আসনের ওপরেই তৈরি হয়েছে এই মহাকালীর বেদি৷ গড়ে উঠেছে সুদৃশ্য মন্দির৷
ইংরেজবাজার ব্যায়াম সমিতির পুজো কমিটির সম্পাদক শুভ্রাংশু দাস বলেন, ‘আমাদের কালীপুজো এবছর ৯৭তম বর্ষে পদার্পণ করল। এবছর প্রতিমা তৈরি করছেন মৃৎশিল্পী শিবু মণ্ডল। দীপাবলির আগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে মহাসাড়ম্বরে দেবীকে মন্দির প্রাঙ্গণে আনা হবে। পুজোর চারদিন গঙ্গাবাগ প্রাঙ্গণে নামী শিল্পীদের নিয়ে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একত্র হয়ে এই পুজোর আয়োজন করি।’ পুজো কমিটির সহ সম্পাদক হিসাবে রয়েছেন সাব্বির হোসেন এবং সহ সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন হাসান আলি।
পুজো কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য কুরবান শেখের কথায়, ‘মহাকালীর দশভুজা রূপের পুজো আয়োজনে আমরা সর্বতোভাবে সাহায্য করি। পুজোর চারদিন মন্দির প্রাঙ্গণেই আমাদের সময় কেটে যায়। ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে আমাদের ব্যায়াম সমিতির পুজো।’
