কল্লোল মজুমদার, মালদা: নীল…, বাড়িতে আছিস? অচেনা কণ্ঠস্বর শুনে মাথার ঘোমটা টানতে টানতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে এক মহিলার প্রশ্ন, ‘আপনারা, ঠিক চিনতে পারলাম না।’ উত্তর পেলেন, ‘আমরা নীলের স্কুল থেকে এসেছি। ও কোথায়? কয়েকদিন ধরে স্কুলে যাচ্ছে না। তাই খোঁজ নিতে এসেছি।’ নীল যে আর স্কুলে যাবে না, সেই দুঃসংবাদ দিয়ে ওই মহিলা বললেন, ‘ওর বাবার সঙ্গে মুম্বই গিয়েছে। ওখানে থেকে কাজ করবে।’
কারও নাম হয়তো অসীম বা সুব্রত। কিন্তু নীলের মতো ওরাও বাড়িছাড়া বাবা, কাকাদের সঙ্গে ভবিষ্যতের আস্তানা খুঁজে নিয়েছে দিল্লি অথবা কেরলে। ওদের স্কুলে যাওয়াটা অত্যন্ত জরুরি বোঝাতে গিয়ে প্রতিটি বাড়ি থেকেই শিক্ষকদের শুনতে হয়েছে, ‘কাজে না গেলে পেট চলবে কী করে’। দিন-দিন কেন স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ছে, তার খোঁজ করতে গিয়েই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে মালদা (Malda) শহরের সরকারি মালঞ্চপল্লি মিনু ঝা বয়েজ হাইস্কুলের শিক্ষকদের। তাঁদের অভিজ্ঞতা, পেটের দায়ে পড়াশোনা ছেড়ে নাবালকরাও হয়ে যাচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিক। প্রধান শিক্ষক উজ্জ্বলকুমার দাসের স্বীকারোক্তি, ‘একটা সময় স্কুলে ছিল হাজারখানেক ছাত্র। কমতে কমতে এখন তা দাঁড়িয়েছে দু’শোর কাছাকাছি। পড়ুয়ারা শুধু ভিনরাজ্যে কাজ করতে চলে যাচ্ছে তা নয়, স্কুলের কাছে রয়েছে আমবাজার। সেখানেও অনেকে আম বিক্রি করছে। অনেকে আবার মাছ ধরে তা বিক্রি করছে বাজারে।’ জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক বাণীব্রত দাসের মন্তব্য, ‘বিষয়টি জানি। কী করা যায় দেখছি।’ ছাত্রসংখ্যা কমতে ধাকায় তিনতলা স্কুল ভবনটি এখন আর আগের মতো সরগরম থাকে না। ১২ জন পূর্ণ সময়ের শিক্ষক এবং একজন প্যারাটিচার মিলে অনায়াসে সামলাতে পারেন পডুয়াদের। স্কুলের এক সহকারী শিক্ষক প্রেমানন্দ সরকার বলছিলেন, ‘ক্লাস নাইন ও টেনের ছেলেদের পড়াশোনা ছেড়ে কাজ করতে চলে যাওয়ার পিছনে রয়েছে এলাকার আর্থসামাজিক ব্যবস্থা।’
স্কুল সংলগ্ন মালঞ্চপল্লির বিলের পাশে বাড়ি কানাইয়ের। কানাইও এখন পরিযায়ী শ্রমিক। ওর মা মালতীদেবী বলছেন, ‘অভাবের সংসার। প্রতিদিন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে চলেছে। তাতে দু’বেলা পেট ভরানো দায়। স্কুলে গেলে একবেলা খেতে পাবে।’
পুরাতন মালদার (Outdated Malda) অন্যতম নাম করা কালাচাঁদ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক রাহুলরঞ্জন দাসের কথায়, ‘শুধু মিনু ঝাঁ বা আমাদের স্কুলই নয়, জেলার গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি স্কুলে একই চিত্র। বিশেষ করে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়ারা ভিনরাজ্যে কাজে চলে যাচ্ছে।’ ইংরেজবাজার ব্লকের সাট্টারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক অভিজিৎ চক্রবর্তী শোনালেন আরও এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর দাবি, ‘নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের গড় হাজিরা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। স্কুলের বহু ছাত্র রয়েছে যারা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে মাত্র। কিন্তু স্কুলে আসে না।’
হরিশ্চন্দ্রপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মফিজুদ্দিন আহমেদ জানালেন, অষ্টম শ্রেণি থেকে প্রচুর ছাত্র বছরের একটা সময়ের পর থেকে আর স্কুলমুখী হচ্ছে না। পার্শ্বশিক্ষকের মাধ্যমে বাড়িতে খোঁজ নিতে গেলে বাড়ির লোক জানাচ্ছেন আগে পেট চালাতে হবে তারপরে শিক্ষা। ছেলে এখন নেই। ভিনরাজ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে রোজগার করছে। তাঁর দাবি, ‘প্রতিবছর নবম শ্রেণি থেকে মাধ্যমিকে রেজিস্ট্রেশন করার সময় দেখা যাচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ জন ছাত্র অনুপস্থিত থাকছে। এরা সবাই কাজের খোঁজে পঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, গুজরাটে চলে যাচ্ছে। এটা বন্ধ করতে গেলে প্রথমেই সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এই সমস্ত ছাত্রদের বিকল্প কোনও অর্থ রোজগারের ব্যবস্থা করা না হলে এই স্রোত বন্ধ করা যাবে না।’
