কল্লোল মজুমদার, মালদা: বহু বছর আগের কথা। তখন চলছে ব্রিটিশ শাসন। এখনকার মালদা (Malda) শহর তখন ছিল জঙ্গলে ঘেরা। আজকের নেতাজি মোড় দিয়ে তখন বয়ে যেত মহানন্দা নদী। আর এই মহানন্দার তীরে ছিল পাঁচ-পাঁচজন ডাকাতের ডেরা। তবে সেই ডাকাতদের নাম জানা না গেলেও জানা যায়, তারা নদীপথে ডাকাতি করার আগে পাঁচ কালীর পুজো করত। কথিত আছে, সেই পাঁচ কালী আসলে পাঁচ বোন। বড় বোনের নাম বুড়া। মেজ বোনের নাম ডাকাত। এরপর যথাক্রমে মশান, কাচ্চি খাওকি আর তারাকালী। আবার পাঁচ বোনের পছন্দের খাবারের তালিকা পাঁচরকম। বুড়াকালীর পছন্দের খাবার ছোলার ডালের খিচুড়ি। ডাকাতকালীর পছন্দ সুরা। মশানকালীর পছন্দের খাবার হল গোটা ফলমূল, আর কাচ্চি খাওকির পছন্দের খাবার হল কাঁচা সন্দেশ। একেবারে ছোট বোন তারাকালীর পছন্দের খাবার হল পায়েস ও ক্ষীর।
বুড়াকালী মন্দিরের সেবায়েত তথা স্বত্বাধিকারী বাবু ভট্টাচার্যের কথায়, ‘এই পাঁচ বোনের আলাদা আলাদা মন্দির রয়েছে। মালদা শহরের প্রাণকেন্দ্র নেতাজি মোড় সংলগ্ন এলাকায় মন্দিরগুলির অবস্থান। আজ মহানন্দা নদী সরে গিয়েছে অনেকটাই। এক সময়ের নদীবক্ষে আজ গড়ে উঠেছে মালদার ব্যস্ততম নেতাজি সুভাষ রোড। তবে আজও কালীপুজোর সময় অত্যন্ত ধুমধাম করে পূজিতা হন এই পাঁচ বোন।’ এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মানসরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘একটা সময় এই পাঁচ বোনের বিসর্জন হত একইসঙ্গে। কিন্তু পরে বুড়াকালীর পাথরের প্রতিমা তৈরি করা হয়। তাই আর বিসর্জন হয় না। এখন একসঙ্গে চার বোনের নিরঞ্জন হয়। তবে বিসর্জনের আগে এই চার বোন বড় দিদির সঙ্গে দেখা করতে ভোলেন না। ধুমধাম সহকারে শোভাযাত্রা হয় বিসর্জনের সময়।’
মালদা শহরের আরেক প্রবীণ বাসিন্দা প্রবীর দে দাবি করেন, ‘আমাদের পরিবারের সদস্যরা প্রতিবছর এই পাঁচ কালীর মন্দিরেই পুজো দেন। এই রীতিই বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। আমাদের বাবা-ঠাকুরদাদের আমল থেকেই এই রীতি চলে আসছে।’
মনোরমা ঝা নামে আরেক প্রবীণ শহরবাসী বলেন, ‘বুড়াকালী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় এর জনপ্রিয়তা বেশি। পুজোর পিছনে রয়েছে ডাকাতদের রোমাঞ্চকর কাহিনী। বাবা বলতেন, ওই পাঁচ ডাকাত পুজো দিয়ে ডাকাতি করতে বেরোতেন। সেই সময় মহানন্দা নদী দিয়ে ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ বণিকদের নৌকা যাতায়াত করত। ওই বণিকরা মালদা থেকে নীল, রেশম, পশমের বস্ত্র সহ নানা জিনিস রপ্তানি করতেন। আরব থেকে বণিকরা আসতেন পারদ নিয়ে। তাঁদের সঙ্গে থাকত মণিমুক্তাও। সেইসব দামি জিনিসের লোভে লুটপাট চালাত ডাকাতরা।’
