হরষিত সিংহ, মালদা: প্রচণ্ড ঠান্ডায় বেলাতেও অফিসের জন্য রাস্তায় বেরোতে মুশকিলে পড়ছে মধ্যবিত্ত। অথচ পেটের টানে ভোরের কুয়াশা ঠেলে বেরিয়ে পড়তে হয় ছায়া, শ্রীমতীদের (Hardships of Ladies)। তারপর সারাদিন একটানা জল ঘাঁটা। ঠান্ডা বলে বাসন মাজা, ঘর মোছা, কাপড় কাচা থেকে তো আর রেহাই নেই। ওরা সবাই পরিচারিকা। সময়মতো বাড়ি বাড়ি না পৌঁছালেই গৃহিণীদের মুখ ভার।
‘পাঁচ বাড়িতে কাজ করি, সবাই তো সমান না। অনেকেই সহানুভূতি দেখায়, আবার কেউ একটু দেরি হলেই কথা শোনায়। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বের হতে হয়।’ সবজি কাটতে কাটতে বলছিলেন ছায়া মণ্ডল। প্রতিদিন ছায়া চারটে বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন। তারপর অবসর সময়ে কেটারিংয়ের রান্নার জোগাড়ের কাজ করে সংসার চালান। এদিকে, মালদায় গত কয়েকদিনে তো একাঙ্কে পৌঁছে গিয়েছে তাপমাত্রার পারদ। বুধবারও প্রচণ্ড ঠান্ডায় ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। একের পর এক বাসা বাড়িতে কাজ করেছেন ঠান্ডার মধ্যেই। ছায়া একা নন। শোভা মণ্ডল, শ্রীমতী সিংহ, বাসনা মণ্ডলের মতো অন্য পরিচারিকারাও তো শীত উপেক্ষা করে কাজ করেই চলেছেন। মধ্যবিত্ত বাবু-বিবির ঠান্ডা জলে হাত দিতে অস্বস্তি। অথচ তাঁরা দিব্যি জল ঘাঁটছেন। ঘর মুছছেন। বাসন মাজছেন। ঠান্ডায় কষ্ট হয় না? প্রশ্ন শুনে হাসলেন ছায়া। বললেন, ‘স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১০ বছর আগে পরিচারিকার কাজ শুরু করি। বসে থাকলে তো চলবে না। লোকের বাড়ি কাজ করে করেই তো মেয়ের বিয়ে দিলাম। কষ্ট করে কাজ করি বলেই তো মেয়ের বিয়েতে মালিকরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।’
সাধারণত আশপাশের গ্রামগুলি থেকে মালদা শহরে আসেন মহিলা পরিচারিকারা। কেউ আসেন পুরাতন মালদার (Malda) সাহাপুর, কাদিরপুরের মতো গ্রাম থেকে। আবার কেউ আসেন ইংরেজবাজার শহর সংলগ্ন নরসিংহকুপ্পা, জহুরাতলা সহ আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রাম থেকে। অধিকাংশ বাড়িতেই ছেলেমেয়েদের সকাল সকাল স্কুল-কলেজ। কর্তাগিন্নির সকাল সকাল অফিস। তাই ছায়াদের কাজে ঢুকে পড়তে হয় ৬টার মধ্যেই। এখন প্রচণ্ড ঠান্ডায় অনেকেই যখন বেলা অবধি লেপের নীচ থেকে বের হচ্ছেন না, তখন ছায়ার মতো শ্রীমতী ঘোষেরও সেই বিলাসিতার সুযোগ বা সময়-কোনওটাই নেই।
শ্রীমতী বলছিলেন, ‘আমাদের যেতে একটু দেরি হলেই অনেকের মুখ ভার হয়ে যায়। কেউ অফিস যাবেন তার আগে কাজকর্ম শেষ করতে হয়। আবার কেউ সকালের কাজগুলি না হলে অন্য কোনও কাজ করতে পারেন না। তাই দাদা-দিদিরা আমাদের ওপরেই অনেকটা নির্ভরশীল। দেরি হলে আবার কথা শুনতে হয়।’
নিম্নবিত্ত পরিবারের এই মহিলারা পেটের দায়ে পরিচারিকার কাজ করেন। বিশেষ করে যেসব সংসারে কর্তা-গিন্নি দুজনেই চাকরিজীবী, সেই সংসারগুলো তো ধরে রেখেছেন এই পরিচারিকারাই। সেকথা অকপটে স্বীকারও করছেন কর্তা-গিন্নিরা। অনেকে পরিচারিকাদের সমস্যা দেখেন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই। ‘এখন যা শীত পড়েছে, যদি কাজের মাসি একটু দেরি করে আসে, বা না আসে, তা হলে কিছু বলার নেই। ওদের অসুবিধাটাও তো বুঝতে পারছি।’ বলছিলেন মালদা শহরের বাসিন্দা জয়শ্রী হালদার। ফুলবাড়ির বাসিন্দা রিঙ্কু সাহার কথায়, ‘আমি তো নিজেই অনেকসময় কাজের মাসিকে বলি, অসুবিধা হলে এসো না। ছুটি নাও। ওদের দিকটাও তো দেখতে হবে।’
