কল্লোল মজুমদার, মালদা: রাত ১১টা। শীতের রাতে মালদা (Malda) শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক মুড়েছে হালকা কুয়াশায়। আর তারই মধ্যে সেই ঘন কুয়াশা ভেদ করে শহরের প্রবেশমুখে নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল একটা পণ্যবাহী লরি। সেই নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই তরুণী। লরিচালকের সঙ্গে ইশারায় কথা হল সামান্য সময়। এক তরুণী উঠে পড়লেন লরির কেবিনে। তারপর কিছু সময়ের অপেক্ষা। কড়কড়ে কিছু টাকা হাতে নিয়ে গুনতে গুনতে নেমে এলেন ওই তরুণী। অপেক্ষা করতে থাকলেন আরও এক খদ্দেরের জন্য। রাতের কুয়াশা ভেদ করে লরিটি চলে গেল তার গন্তব্যের উদ্দেশে। কিন্তু, ওই লরিচালক বুঝলেন না কি বিপদ ডেকে আনলেন নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য।
মারণ রোগ এইডস ছড়িয়ে পড়ার জন্য কার্যত লরিচালক, পতিতাবৃত্তি আর পরিযায়ীদের অসতর্ক জীবনযাপনকে দায়ী করা হচ্ছে। আর তার ফলে মালদা জেলাজুড়ে বাড়ছে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত এই জেলায় এই আক্রান্তের সংখ্যা ৩০৫৮। এই পরিসংখ্যানটা যদি আপনার ভয়াবহ মনে হয়, তাহলে চমকে ওঠার মতো পরিসংখ্যান হল, ওই ৩০৫৮ জন আক্রান্তের মধ্যে নাবালক-নাবালিকার সংখ্যা ২৭৮ জন। এরমধ্যে রয়েছে ১৪০ জন ছেলে এবং ১৩৮ জন মেয়ে। যাদের বয়স ১৫ বছরের নীচে। স্বাস্থ্য দপ্তরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, প্রতিবছর গড়ে আড়াইশো করে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
স্বাস্থ্য দপ্তরে কর্তাদের চিন্তার বড় কারণ হল নাবালকদের মধ্যে এইডস ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি। উদ্বেগের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন ডেপুটি সিএমওএইচ-২ ডাঃ অমিতাভ মণ্ডল। তাঁর মন্তব্য, ‘আমরা নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছি। গর্ভবতী অবস্থা থেকে প্রসব হওয়ার আগে পর্যন্ত বেশ কয়েকবার মায়ের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু বেসরকারি নার্সিংহোমগুলোতে পরীক্ষার পরিকাঠামো থাকলেও করা হয় কি না তা আমি বলতে পারব না।’ তিনি জানান, প্রতিবছর গড়ে ২৫০ করে নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তাঁর মন্তব্য, ‘গত বছরের পরিসংখ্যান এখনই দিতে না পারলেও বলতে পারি, নাবালকদের আক্রান্তের সংখ্যাটা ছিল ২২৮-এর কাছাকাছি।’ তাদের মধ্যে ১১০ জন নাবালক ও ১১৮ জন নাবালিকা। অর্থাৎ এক বছরে সার্বিক সংখ্যাটা প্রায় চার ভাগের একভাগ বেড়েছে।
অল্পবয়সিদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বাড়ছে কেন? গাজোল স্টেট জেনারেল হাসপাতালের কাউন্সেলার রাজীবকুমার দাস মন্তব্য করেন, ‘এইডস আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের থেকে শিশুদের মধ্যে সেই মারণ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে সরকারি প্রচারের জন্য মানুষ আজকাল অনেক সচেতন হয়েছেন। কন্ডোম ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।’
এদিকে সরকারি দপ্তরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, মূলত চারভাবে এইডস ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে নিষিদ্ধপল্লিতে যাতায়াত, তেমনই রয়েছে ট্রাকচালক, পরিযায়ী শ্রমিক এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করার অভ্যাস। সোমবার মালদা শহরের রেডলাইট এরিয়া হংসগিরি লেনেও সচেতনতা দিবস পালন করা হয় দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি মালদা শাখার তরফে। সংগঠনের কাউন্সেলার আম্বারি খাতুনের দাবি, ‘মালদার যৌনকর্মীদের পল্লিতে এখন আর কোনও এইডস আক্রান্ত যৌনকর্মী নেই। নতুন কর্মী কেউ এলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা এইচআইভি পরীক্ষা করে নিচ্ছি।’
