অভিষেক ঘোষ, মালবাজার: দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ভাপা পিঠের ব্যবসা করছেন তিনি। পিঠে খেয়ে কোনও খদ্দের ১০০ বা ২০০ টাকার নোট দিলে সেই টাকা না নিয়ে বিনে পয়সায় ছেড়ে দেন। বলেন, ‘আজ না হলে অন্যদিন দাম দেবেন।’ এমনকি কারও কাছে টাকা না থাকলেও সেই খদ্দেরকে পিঠে দিয়ে ঈশ্বর সেবার সঙ্গে তুলনা করেন। এমনই মানুষ মালবাজারের (Malbazar) দয়াল মণ্ডল।
তাঁর তৈরি ভাপা পিঠে খাননি এমন মানুষ কমই রয়েছেন। নিজের বাড়িতে ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করেন। সেই চালের গুঁড়ো, খেজুরের গুড়, একটি ছোট স্টোভ নিয়ে সোম থেকে বৃহস্পতিবার মাল থানার সামনের ফুটপাথে একটি ছেঁড়া ছাতার নীচে বসেন। পিঠের দাম মাত্র ১০ টাকা। দয়ালের তৈরি পিঠের পাশাপাশি তাঁর স্বভাবেরও সুনাম করেন অন্য ব্যবসায়ী ও খদ্দেররা। স্থানীয় বাসিন্দা সন্দীপ দােসর কথায়, ‘দয়াল মণ্ডলের ভাপা পিঠের স্বাদ যথেষ্ট ভালো। শীতে এমন গরম গরম পিঠে কার না ভালো লাগে!’
প্রতিদিন সকাল ৮টায় বাড়ি থেকে বের হন। ১০টার মধ্যে ফুটপাথে বসে যায় দোকান। বেশি শীত পড়লে কখনও হঠাৎ দেির হয়। সপ্তাহে চারদিন মালবাজারে শুধু পিঠে বিক্রি করলেও শুক্রবার তিনি নাগরাকাটা হাটে পিঠের সঙ্গে দেন তেলেভাজার দোকান। শনিবার বাড়িতে থাকলেও ছুটি নেই তাঁর। এই দিনে ব্যবসার সামগ্রী জোগাড় করেন তিনি। রবিবার তিনি বসেন মেটেিল হাটে। সেখানেও পিঠের দোকান দেন তিনি।
দয়ালের বর্তমান ঠিকানা নাগরাকাটার শুল্কা মোড়। ২০১০ সালে নাগরাকাটায় আসার আগে তাঁর পরিবার থাকত কোচবিহার জেলায়। তখন তিনি সাইকেলভ্যান চালাতেন। ডুডুয়া নদীর ভয়াবহ বন্যার পর চলে আসেন নাগরাকাটায়। সেই থেকে এখানেই বাড়ি বানিয়ে থেকে যান। কিন্তু ভাপা পিঠের ব্যবসায় কেন? দয়ালের কথায়, ‘ফাস্ট ফুডের ভিড়ে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে ভাপা পিঠে। তাই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং পেটের টানে এই পেশাকে বেছে নেওয়া।’
ফুটপাথে ভাপা পিঠে বিক্রি করে তিনি সন্তানদের মানুষ করেছেন। তিন ছেলেই এখন কাজ করছেন। একমাত্র মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন। ছোটবেলায় টাইফয়েড জ্বরের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় দয়ালের। কিন্তু চার ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই ছেলেমেয়েই স্নাতক পাশ করেছেন। দয়ােলর কথায়, ‘আমি পড়ালেখা না জানলেও ছেলেমেয়েরা নিরক্ষর নয়, সেখানে আমি সফল।’ আর জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে তিনি পাশে পেয়েছেন স্ত্রী দীপালিকে। স্বামীর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘কম বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল, সেই পরিশ্রম এখনও করছেন তিনি। তবে সরকারি র্যাশন ছাড়া আর কোনও সুবিধা নেই আমাদের।’
এভাবেই চলছে তঁাদের। দিনে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা বিক্রি হলে সব খরচ বাদ দিলে দয়ালের হাতে থাকে ১০০ থেকে ১২০ টাকা। হাটে বিক্রি বেিশ হলে সেই লাভের অংশ খানিকটা বাড়ে। তবে দিনের শেষে ৩০০ টাকা হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরলেও, তা দিয়ে দু’মুঠো শাকভাত জোটে।
