বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি: রাজনীতির স্বর্ণযুগে স্বামী-স্ত্রী দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন। ময়নাগুড়িতে সিপিএমকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। তারপর ১৯৮৭ সালে পারিবারিক চাপে দুজনেই দল থেকে অব্যাহতি নেন। তারপর অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গিয়েছে। শহরের দলীয় কার্যালয়ে পা রাখেননি কেউই। ময়নাগুড়ির (Mainaguri) সেই দাপুটে দম্পতি অরবিন্দ পাল এবং ডলি পালের কথা আজও ভুলতে পারেননি এলাকার অনেকেই। অরবিন্দ মারা গিয়েছেন ২০১০ সালে। তারপর থেকে কার্যত গৃহবন্দি একাশি বছরের ডলি।
অরবিন্দ প্রথমে সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তারপর এলাহাবাদের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখার স্টেনোগ্রাফারের চাকরি ছেড়ে ময়নাগুড়ি শহরে পাড়ি দেন দলের কাজ করার তাগিদেই। ময়নাগুড়িতে শিক্ষকতা করেছেন প্রাক্তন সেনাকর্মী। বহু বছর সিপিএমের ময়নাগুড়ি লোকাল কমিটির সদস্য ছিলেন।
স্ত্রী ডলি পালও একাধিকবার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য হয়েছিলেন। টানা বিয়াল্লিশ বছর ময়নাগুড়ি শহরের ১ নম্বর আরআর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। আন্দোলন শুরু হয়েছিল তারও আগে। সেইসময় থেকে দলের মহিলা সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির ময়নাগুড়ি ব্লক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন মহিলা সংগঠনের জলপাইগুড়ি জেলা কমিটির সদস্যও।
১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে জরুরি অবস্থা চলাকালীন সিপিএমের লাল ঝান্ডা কাঁধে সবার প্রথমে লড়াই করেছেন তিনি। সিপিএম নেতা স্বামীকে পাকড়াও করতে দিনরাত বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল পুলিশ। পুলিশের জেরাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন মহিলা নেত্রী।
ডলি বলেন, ‘সময় বদলে গিয়েছে। ভালোবেসে দলের কাজ করেছি। স্বামীও পার্টি ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছি। কিন্তু প্রায় চার দশক পার্টির সঙ্গে কোনও যোগ নেই।’
একসময় অরবিন্দ অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। সেসময় দলের কয়েকজন নেতা-কর্মী বাড়ি এসে খোঁজ নিয়েছিলেন। তাতে অবশ্য দলের প্রতি কোনও ক্ষোভ নেই বর্ষীয়ান সিপিএম নেত্রীর। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের রাজনীতির বিস্তর ফারাক রয়েছে বলে মনে করেন। তখন নেতা-কর্মীদের লড়াইটা ছিল মানুষের জন্য। এখন সমস্তটাই স্বার্থের লড়াই।
সিপিএমের জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হরিহর রায় বসুনিয়া বলেন, ‘ডলি পাল এমন একজন নেত্রী, যিনি মহিলা আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলকভাবে সফল।’ কংগ্রেসের ব্লক সভাপতি প্রদীপ ঘোষালের গলায় প্রশংসার সুর। তাঁর কথায়, ‘ডলি পাল সেই আমলে মানুষের উপকারের জন্য নিজেই মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াতেন। এখন মানুষ নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়ান।’ ময়নাগুড়ি-১ ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি বাবলু রায়ও একই কথা বললেন।
