বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি: ভোজনরসিক বাঙালির কাছে অত্যন্ত প্রিয় নলেন গুড় এবং এই গুড়ের তৈরি রকমারি মিষ্টি। আর তাই জাঁকিয়ে শীত না পড়তেই ময়নাগুড়ি (Mainaguri) বাজারে চলে এসেছে দক্ষিণবঙ্গের নলেন গুড়। কোনওটা গোলা আকারে, কোনওটা রুপোলি মোড়কে ঢাকা। এছাড়া কনটেনারেও ঝোলা নলেন গুড় (Nalen Jaggery) পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এরমধ্যেই রয়েছে ভেজাল নলেন গুড়ের কারবার, যা ক্রেতারা ধরতেও পারছেন না।
কনটেনারে ঝোলা নলেন গুড় কিনে বাড়ি গিয়ে দেখা গিয়েছে, তাতে মেশানো রয়েছে চিনি। বিষাক্ত কোনও রঙিন উপকরণ মেশানো রয়েছে কি না তা নিয়েও ধোঁয়াশা থাকছে। ময়নাগুড়ি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক সুমিত সাহার কথায়, ‘বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শীতের দেখা নেই, ঠিক সেই সময় গোটা বাজার ছেয়েছে নলেন গুড়ে। কী করে সম্ভব? গরমেও কি খেজুর গাছে রস হতে পারে? দামেরই বা এতটা হেরফের কেন হবে? কোনও রাসায়নিক মেশানো রয়েছে কি না সেটাও কিন্তু প্রশাসনের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।’
এ ব্যাপারে জানতে এদিন জলপাইগুড়ি জেলার ফুড সেফটি অফিসার রাজেন রাইকে ফোন করেও পাওয়া যায়নি। যদিও পুরসভার চেয়ারম্যান মনোজ রায় বলেন, ‘বিষয়টি উদ্বেগজনক বটেই। ফুড সেফটি দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
দক্ষিণবঙ্গের কিছু সরবরাহকারী উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় নিজেরাই এসে গুড় পৌঁছে দিয়ে যান। গুড় প্রধানত আসে মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়া থেকে। প্রতি কিলোগ্রাম দর ৬০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। ব্যবসায়ীদের দাবি, চিনির পরিমাণের জন্য দামের হেরফের হয়। চিনি ছাড়া এই গুড় তৈরি কোনওভাবেই সম্ভব নয়।
যদিও রাসায়নিক নেই বলেই দাবি করেছেন নলেন গুড় সরবরাহকারী মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়ার বাসিন্দা মিলন মণ্ডল। তাঁর কথায়, ‘চিনির পরিমাণের উপর দামের হেরফের হয়। অন্য কোনও রাসায়নিক থাকে না। তবে চিনি ছাড়া এই গুড় তৈরি করা কোনওভাবেই সম্ভব নয়।’ তাঁর কথায় সায় জানান নলেন গুড় বিক্রেতা দেবজিৎ সাহাও।
অর্থাৎ নলেন গুড় খাওয়া মানেই ঘুরিয়ে চিনি খাওয়া। ষাট, সত্তর, আশি কিংবা একশো টাকা কেজি দরের নলেন গুড়ে স্বাদ ও গন্ধের কোনও বালাই নেই। আছে শুধু রং। মুদিখানা ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক এবং নলেন গুড় বিক্রেতা নয়ন সাহার কথায়, ‘ যত বেশি দাম তত বেশি স্বাদ। চিনি ছাড়া নলেন গুড় তৈরি সম্ভব নয়।’
জল্পেশের বাসিন্দা মিষ্টির দোকানের মালিক কৃষ্ণ মণ্ডল এদিন নয়নের দোকান থেকে ৬৫ টাকা কিলো দরে প্রায় সাড়ে পাঁচ কেজি নলেন গুড় কিনলেন। নয়নের বক্তব্য, এটা স্রেফ রসগোল্লা তৈরির জন্য। রং হবে, গন্ধ থাকবে না। যদিও কৃষ্ণ বললেন, ‘আমাদের এটাই যথেষ্ট।’
কারও কারও প্রশ্ন, শুধুমাত্র চিনিতেই কি এই রং হওয়া সম্ভব? ময়নাগুড়ির প্রবীণ গুড় বিক্রেতা দশরথ সাহা অবশ্য জানান, এক কিলো রস থেকে গুড় তৈরি হবে খুব বেশি হলে ২০০ গ্রাম। সেই নলেন গুড়ের প্রতি কেজি বাজারদর হবে কমপক্ষে এক হাজার টাকা প্রতি কিলোগ্রাম। সেটা আর কেউ কিনে খাবেন না। রস থেকে চিনি ছাড়া গুড় আসবেই না।
