বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি: ময়নাগুড়ি পুরসভার (Maynaguri Municipality) নিজস্ব অফিস বিল্ডিং নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। আর্থমুভার দিয়ে মাটি খোঁড়ার কাজ চলছে। সেই মাটি ট্রলিতে বোঝাই করে নিয়ে গিয়ে ময়নাগুড়ি (Mainaguri) পুরসভার চেয়ারম্যান মনোজ রায়ের জমি ভরাট চলছিল। এ কথা জানাজানি হতেই মঙ্গলবার শোরগোল পড়ে যায় শহরজুড়ে। মাটি ভরাটের কাজ বন্ধও করে দেওয়া হয়। যদিও ইতিমধ্যেই প্রায় কুড়ি ট্রলি মাটি ফেলা হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয় দলের অভ্যন্তরেও।
তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) পরিচালিত পুরসভার চেয়ারম্যান মনোজ রায় টানা ১২ বছর দলের ময়নাগুড়ি-১ ব্লক সভাপতি ছিলেন। ১৬ নম্বর ওয়ার্ড বিবেকানন্দপল্লির বাসিন্দা তিনি। একেই পুরসভার অফিস বিল্ডিংয়ের মাটি, তার উপর যে কোনও জমি ভরাটের ক্ষেত্রে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের অনুমতি প্রয়োজন। সেটাও মনোজ মৌখিকভাবে জানিয়েই কাজ করাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ।
পুর চেয়ারম্যান হয়েও এমন কাজের জন্য মনোজের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন ময়নাগুড়ি ব্লক ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক ভিক্টর সাহা।
শহরের উদ্যান ঘেঁষে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পুরসভার বহুতল অফিস নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ১৬ নম্বর ওয়াের্ড চেয়ারম্যানের পৈতৃক বাড়ি সংলগ্ন নিজস্ব জমিতে এদিন ভরাটের কাজ চলছিল। চেয়ারম্যান বলেন, ‘এজেন্সিকে বরাত দেওয়া হয়েছে। মাটি রাখার জায়গা ছিল না। সেই কারণেই নিজের টাকায় ট্রলি ভাড়া করে ওখানে মাটি রাখতে বলেছি। প্রয়োজনে সেই মাটি ফেরত দিয়ে দেওয়া হবে। সেকথা মৌখিকভাবে ব্লক ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরকেও জানানো হয়েছে।’
বরাতপ্রাপ্ত এজেন্সি এনকে এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার সুনীল রাউতের কথায়, ‘ওই মাটি রাখার জায়গা নেই। ওই মাটিতে কোনও কাজও হবে না। রাফ বালি দিয়ে ভরাট করা হবে। মাটির জন্য নির্মাণসামগ্রী রাখতে সমস্যা হচ্ছে। যে কেউ চাইলে তা নিতে পারেন।’
একদিকে পুরসভার চেয়ারম্যান, অন্যদিকে শাসকদলের প্রভাবশালী নেতা মনোজ রায়। তাঁর এই কাজের তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা। সমালোচনা শুরু হয়েছে দলের অভ্যন্তরেও। সিপিএমের জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হরিহর রায় বসুনিয়া বলেন, ‘সরকারি মাটি নিয়ে কোনওভাবেই এটা করা যায় না। তাছাড়া যে কোনও জমি ভরাটের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। ওঁদের কাছে আইন বলে কিছু নেই। ওঁরা যেটা করেন সেটাই আইন।’ বিজেপির জলপাইগুড়ি জেলার সহকারী সভাপতি চঞ্চল সরকার বলেন, ‘মাটি চুরি নিতান্তই সাধারণ বিষয় তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে। কেন্দ্রীয় সরকারের হাজার কোটি টাকা লুটপাট করছে। জনগণের সেবার নাম করে নিজেদের পকেট ভরার দল।’
মনোজ যাই বলুন না কেন, দলের স্থানীয় নেতারাও খুব একটা পাশে নেই তঁার। জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক তথা ময়নাগুড়ি পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান সোমেশ সান্যালও মনে করছেন, ‘এটা ভুল কাজ। না হলেই ভালো হত।’ তৃণমূল কংগ্রেসের ময়নাগুড়ি টাউন ব্লক সভাপতি বিশ্বজিৎ সেন বলেন, ‘বিষয়টি জানা নেই, খোঁজ নিয়ে দেখছি।’ ময়নাগুড়ি টাউন ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পাদক তুহিন মজুমদার বলেন, ‘পুরসভার চেয়ারম্যান বলে কথা। কাজেই কাজকর্ম বিবেচনা করেই করা উচিত।’ শহরের সাধারণ নাগরিকরাও এমন ঘটনায় তীব্র সমালোচনা করছেন। শহরের এক বাসিন্দা বলেন, ‘যাঁরা রক্ষক তাঁরাই ভক্ষক। যাঁরা নাগরিকদের শেখাবেন তাঁরাই ভুল পথে চলছেন।’
এর আগে অনলাইনে পুরসভার শববাহী গাড়ি কেনা নিয়েও শহরজুড়ে শোরগোল পড়ে। গভর্নমেন্ট ই-মার্কেটপ্লেস থেকে গাড়ি কেনা হয়। ওয়েবসাইটে এই গাড়ির দাম ৯ থেকে ১০.৫০ লক্ষ টাকা। মডিফিকেশনের খরচ মিলিয়ে দাম সাড়ে ১২ লক্ষ টাকা। সেই গাড়ি ২১ লক্ষ টাকায় কেনা হয়েছে। এদিন জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মহুয়া গোপ বলেন, ‘এজেন্সি কাজ করছে। পুরসভা কিংবা চেয়ারম্যানের কোনও বিষয় নেই। তথাপি চেয়ারম্যানের উচিত ছিল বিকল্প কোনও ব্যবস্থা করা। এটা না করলেই ভালো হত।’
ব্লক ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক ভিক্টর সাহা বলেন, ‘চেয়ারম্যান মৌখিকভাবে আমাকে জানিয়েছেন, মাটি রাখার জায়গা নেই। সেই কারণেই ওখানে মাটি নিয়ে গিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে এখনও তদন্ত শুরু করিনি। তবে খতিয়ে দেখা হবে।’
