মালদা: রাসায়নিক দূষণের জেরে দিল্লির (Delhi) যমুনা নদীতে যেভাবে সাদা ফেনার আস্তরণ দেখা যায়, এবার সেই একই দৃশ্য ধরা পড়ল মালদার মহানন্দা নদীতেও (Mahananda River Air pollution)। বুধবার সকালে মালদা শহরের পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানন্দার বুকে ভাসতে দেখা গেল বিশালাকার সাদা ফেনার স্তূপ, যা ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে পরিবেশবিদ ও নদীপ্রেমীদের মধ্যে।
মালদা (Malda) শহরের শুভঙ্কর বাঁধ রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রামনগর কাছারির দিকে প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়ে এই দৃশ্য দেখে প্রথমে হতবাক হয়ে যান শিক্ষক জয়ন্ত চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল নদীতে যেন বড় বড় বরফের টুকরো ভাসছে। পরে কাছে গিয়ে বুঝতে পারি সেগুলো আসলে ফেনা। মনে হয়, দূষণের জন্যই এসব হচ্ছে।’
কিন্তু হঠাৎ মহানন্দায় এমন ছবি দেখা গেল কেন? ওয়াকিবহাল মহল অবশ্য এজন্য দূষণকেই দায়ী করেছে। গৃহস্থালির বর্জ্য বা বায়োওয়েস্টের দূষণ, কোনটা যে নির্দিষ্ট কারণ, নাকি সবকিছু মিলেমিশেই এই কাণ্ড, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী সংস্থার রূপক দেবশর্মার অভিযোগ, ‘৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বায়োওয়েস্টযুক্ত বর্জ্য রামনগর কাছারির নবনির্মিত ড্রেন দিয়ে মহানন্দায় ফেলা হয়। সেজন্যই সেখানে নানা রাসায়নিক পদার্থ এসে জলে মেশে। তা থেকে ফেনা তৈরি হয়ে দূষণ ছড়াচ্ছে।’ এই বায়োওয়েস্ট নদীতে ফেলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ৯টি পরিবেশপ্রেমী সংগঠনের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু বর্জ্য পরিশোধনের প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গৃহস্থালির ডিটারজেন্ট, অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্য নদীর জলে মিশে এই ধরনের ফেনার সৃষ্টি করে। এসব বর্জ্যে থাকা ফসফেট ও অন্যান্য রাসায়নিক জলের গুণমান নষ্ট করে এবং জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে জলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে মাছ সহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যুও ঘটতে পারে। পাশাপাশি এই দূষিত ফেনা মানুষের ত্বক ও শ্বাসযন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকর। এভাবে মহানন্দায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত পরিবেশপ্রেমীরা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মহানন্দাকে দূষণমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার কোনও প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং প্রশাসনিক উদাসীনতায় নদীর দূষণ আরও বেড়েছে। কিন্তু কে কাকে বলবে? এলাকার বাসিন্দা শ্যামল পালের অভিযোগ, ‘ইংরেজবাজার পুরসভা না হয় শহরের জল জমা থেকে মুক্তি পেতে হাইড্রেনের মাধ্যমে নদীতে দূষিত জল ফেলছে। কিন্তু ঠিক এর সামনেই সেচ দপ্তর। ওই দপ্তরের কর্তারা কীভাবে অনুমতি দিলেন? নাকি দেখেও না দেখার ভান করেন। রাজ্য সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।’
যমুনার মতোই মহানন্দার বুকে ভেসে ওঠা এই ফেনা শহরবাসীর কাছে এক বড় সতর্কবার্তা। বলছেন নদীপ্রেমীরা। পরিবেশপ্রেমীদের দাবি, অবিলম্বে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, পয়ঃবর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করা এবং মহানন্দাকে দূষণমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ করা জরুরি। মালদা বিজ্ঞানমঞ্চের জেলা সভাপতি সুনীল দাসের অভিযোগ, ‘মহানন্দার জল কীভাবে দূষিত হচ্ছে তা জানিয়ে পুর প্রশাসন এবং সেচ দপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছিলাম। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুই হয়নি। বরং নদীগর্ভে পিলার দিয়ে পাকা বাড়ি তৈরি হয়ে যাচ্ছে।’
মাধবনগরে শহরের নোংরা এবং দূষিত জল হাইড্রেনের মাধ্যমে মহানন্দাতে ফেলা হচ্ছে। ড্রেন তৈরির সময় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল ড্রেনের জল উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট করে মহানন্দাতে ফেলা হবে। কিন্তু বর্তমান চিত্র অন্য কথা বলছে। কোনও ট্রিটমেন্ট ছাড়াই নদীতে জল পড়ছে। দূষিত জলের ফেনায় এলাকার মানুষজন আতঙ্কিত। নদীতে স্নান করতে গেলে তাদের শরীর চুলকাচ্ছে এবং চামড়ার অসুখ হচ্ছে। সুনীলের কথায়, ‘মানুষ এই দূষণ থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইছেন। আমাদের কাছেও আবেদন জানাচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসন ভ্রূক্ষেপহীন।’

