শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি: টানা বর্ষণে মহানন্দায় জল বেড়েছে অনেকটা (Mahananda River)। গ্রিন ট্রাইবিউনালের নির্দেশে নদী থেকে বালি তোলা এমনিতেই নিষিদ্ধ। তারপরও অবাধে বালি চুরি চলছে। ঝুঁকি নিয়ে মহানন্দায় নেমে তোলা হচ্ছে বালি। পরিস্থিতির সুযোগে তা বিক্রি করা হচ্ছে চড়া দামে। এমনই অভিযোগ উঠেছে শিলিগুড়ি শহরের বিদ্যাচক্র কলোনি, গুরুংবস্তি, জ্যোতিনগর সহ বিভিন্ন এলাকায়। পুরনিগমের ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকার অবশ্য বলছেন, ‘বিষয়টা দেখা হচ্ছে। পুলিশ ও প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই ব্যাপারটা দেখবে।’
বুধবার সকাল দশটা নাগাদ বিদ্যাচক্র কলোনিতে গিয়ে দেখা গেল, নদীর চরে সাজানো রয়েছে বালিভর্তি বস্তা। একে একে সেই বস্তাগুলো ভ্যানে তুলছিলেন ধিরাজ রায়, মহম্মদ আদিলরা। বালি থেকে তখনও চুইয়ে পড়ছে জল। বোঝাই যাচ্ছিল, মহানন্দার তীব্র স্রোতের মধ্যেই ওই বালি তোলা হয়েছে। ভ্যানে তুলে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বালির বস্তা? প্রশ্ন করতেই ওই তরুণদের মধ্যে একজন বলে উঠলেন, ‘আপনার দরকার হলে রাতের মধ্যে ফোনে বলে দেবেন। সকাল এগারোটার মধ্যে রেডি হয়ে যাবে।’ দাম কত? জবাব এল, ‘এক ভ্যান বালির জন্য দিতে হবে দেড় হাজার টাকা।’ এক ভ্যান বালির জন্য এত টাকা কেন? ধিরাজের বক্তব্য, ‘এই স্রোতের মধ্যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমরা বালি তুলছি। টাকা তো লাগবেই।’ কোথাও আবার ভ্যান প্রতি বালি বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকা। বালির চাহিদা ও অতিরিক্ত মুনাফার জন্যই যে তাঁরা এই ঝুঁকি নিচ্ছেন, সেকথা স্বীকার করে নিচ্ছেন কুলিপাড়ার অঞ্জু, গুরুংবস্তির অমলরা।
শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদী থেকে অবৈধভাবে বালি তোলার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে গুরংবস্তির মহানন্দা চর এলাকায় এই ছবি সবসময় দেখা যায়। এদিন সেখানে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, প্রতি ভ্যান বালির দাম দেড় হাজার টাকা হয়ে গিয়েছে।
নদীতে কোমরসমান জলে নীচু হয়ে বালি তোলার চেষ্টা করছিলেন বছর পঞ্চাশের অবনী মাহাতো। দাম জিজ্ঞেস করতে কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘নিলে নিন। নইলে ছেড়ে দিন।’ সেখানে দেখা গেল, দশ, পনেরো বছরের অনেক কিশোরও নদীতে নেমে বালি তোলার চেষ্টা করছে।
জ্যোতিনগরের নদীচর এলাকাতেও একই ছবি। স্থানীয় বাসিন্দা অশোক মাহাতো বললেন, ‘সোমবার কিছু লোক বস্তিতে এসে বালির খোঁজ করছিলেন। এরপর আমরা বন্ধুরা পরিকল্পনা নিলাম, নদী থেকে বালি তুলে বিক্রি করব। পাঁচ বন্ধু রয়েছি, দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করলে তিনশো টাকা করে প্রত্যেকের উপার্জন হবে।’
পুজোর পর শহরে বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজ হয়ে থাকে। ফলে বালির চাহিদা থাকে। যদিও এবারে নদীর ভয়াল রূপে সমস্যা তৈরি হয়েছে বালি নিয়ে। এই পরিস্থিতিতে অনেকে চর এলাকার বস্তিগুলোতে বালির খোঁজ করতে যাচ্ছেন। মুনাফা লুটতে এই সুযোগ নিচ্ছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তবে এভাবে বালি তোলায় একদিকে যেমন নদীর ক্ষতি হচ্ছে, তেমনই যে কোনও মুহূর্তে বড় বিপদ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা।
