নিউজ ব্যুরো: প্রয়াগরাজে (Maha Kumbh Stampede) বিপর্যয়। পুণ্য লাভের আশায় অমৃত কুম্ভের সন্ধানে গিয়ে জীবন বিপন্ন হল বহু মানুষের। মৌনী অমাবস্যার রাতে অমৃত স্নানযাত্রায় ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এখনও পর্যন্ত খবর, মানুষের পায়ের চাপে প্রাণ গিয়েছে প্রায় ৩০ পুণ্যার্থীর। আহতের সংখ্যা শতাধিক। ঘটনার পর থেকে ত্রিবেণী সঙ্গমে শুধুই আতঙ্ক আর শোকের ছায়া। সেই উদ্বেগ ও আতঙ্কের ছায়া এসে পড়েছে মহাকুম্ভ থেকে শত যোজন দূরের গৌড়বঙ্গেও। গৌড়বঙ্গের তিন জেলা থেকেই হাজার হাজার পুণ্যার্থী গিয়েছেন অমৃত স্নানে। তাঁদেরই অনেকে ফোন করে উত্তরবঙ্গ সংবাদকে জানালেন সেই রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা।
বুধবার সকালেই বাড়ির লোকদের ফোন করে ঘটনার কথা জানিয়েছেন রায়গঞ্জের বাসিন্দা সুজিত গোস্বামী। তাঁর কণ্ঠে তখনও ভয়ের কাঁপন। কাঁপা গলাতেই বললেন, ‘রাত দুটো নাগাদ সঙ্গমে স্নানের উদ্দেশ্যে জড়ো হন পুণ্যার্থীরা। একসঙ্গে ঠাসাঠাসি দশ হাজারেরও বেশি মানুষ। হঠাৎ ১১ থেকে ১৭ নম্বর খুঁটির মাঝে প্রবল ভিড়ের চাপে ব্যারিকেড ভেঙে যায়। ব্যারিকেড ভাঙতেই আরও প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি। কে পড়ল, কে মরল, দেখাদেখি নেই। যার জেরেই এই দুর্ঘটনা।’
রায়গঞ্জের (Raiganj) অপর এক বাসিন্দা নিরঞ্জন মণ্ডলের কথায়, ‘ধীরে ধীরে স্নানের জন্য এগোচ্ছিলাম। আচমকাই ভিড় বেড়ে যায়। হঠাৎ প্রচন্ড ধাক্কাধাক্কি আর ঠেলাঠেলি শুরু হল। আমরা চেষ্টা করেছিলাম সরে আসতে। কিন্তু তার কোনও উপায় ছিল না। সবাই ধাক্কা দিচ্ছিল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কোনওক্রমে বেঁচে গিয়েছি।’
মালদা (Malda) থেকেও বহু মানুষ কুম্ভে রয়েছেন। অনেকে আবার যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিনের ঘটনার খবর পৌঁছাতেই জেলায় তাই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অজয় গঙ্গোপাধ্যায় এদিন বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ইংরেজবাজার পুরসভার নেতাজি মোড়, রামকৃষ্ণপল্লী, পুড়াটুলি থেকে ১৫ জনের একটি দল কুম্ভ মেলা গিয়েছেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা আতঙ্কে ছিলাম। ফোনে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, তাঁরা সবাই ঠিক রয়েছেন।’
হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়েছিলেন দক্ষিণ দিনাজপুরের (Dakshin Dinajpur) কুমারগঞ্জের প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক কমল কুমার বিশ্বাস। সেখান থেকে কোন রকমে প্রাণে বেঁচে ফেরেন তিনি। কমলবাবু কথায়, ‘হুড়োহুড়ির মধ্যে যেভাবে নিচে পড়ে গেছিলাম, ভেবেছিলাম আর বেঁচে ফিরতে পারব না। সেখান থেকে কোনরকমে উঠি। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বহু মানুষ পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছেন। আজ প্রায় ৩০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে প্রয়াগ রাজ থেকে বেড়িয়েছি।’ তাঁর সঙ্গে আরো ১১ জন ছিলেন। তাঁরাও হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। তবে সকলেই অক্ষত রয়েছেন।
কীভাবে এতবড় দুর্ঘটনা ঘটল তার একটা ছবি পাওয়া গেল রায়গঞ্জের সুজিত গোস্বামীর বিবরণে। তিনি জানান, মেলার মধ্যেই অনেকে ব্যাগ নিয়ে শুয়েছিল। তবে প্রশাসন খুবই তৎপর ছিল। ব্যবস্থাও খুব ভালো। কিন্তু কিছু নিশ্চয়ই ফাঁক ফোকর ছিল। রাত যখন সাড়ে বারোটা। মানুষের একটা স্রোত ছিল। একটা রাস্তায় তো মানুষকে ধরার নির্দিষ্ট ক্যাপাসিটি থাকে। কিন্তু সমুদ্রে সুনামির যেমন ওভারফ্লো হয়ে যায় সেই রকম ওভার ফ্লো হয়ে মানুষ ঢুকতে শুরু করল একটি রাস্তা দিয়ে। ভিড় কন্ট্রোল করা পুলিশের পক্ষে সম্ভবই ছিল না। বন্যার জলের মতন মানুষের স্রোত ঢুকে গেল। এরা সম্ভবত কোথাও শুয়ে বা বসে ছিল। মিছিল ঢুকছে হৈ হৈ করে। মানুষও ঢুকছে। যারা মাঝে শুয়ে ছিল তাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। ওই দৌড়াদৌড়ির মাঝেই যারা পড়ে যায় তাদের এই মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে। সুজিত বলেন, “আমরা ভোর চারটা নাগাদ স্নানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে দেখতে পাই, রাস্তার মধ্যেই বহু মানুষের ব্যাগ, কম্বল, চাদর, কাপড় পড়ে রয়েছে। এই দৃশ্য দেখে আমাদেই ভয় লাগছে।”
