রায়গঞ্জ: একদিকে মাতৃবিয়োগের অসহ্য যন্ত্রণা, অন্যদিকে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা— এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এক অনন্য লড়াই লড়ছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী নন্দিনী বর্মণ (Madhyamik Pupil Loss Mom)। বুধবার পরীক্ষার শেষ দিনে নন্দিনীর সেই লড়াইকে সম্মান জানাতে এবং তাঁর প্রয়াত মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে এক অভিনব শোকসভার আয়োজন করলেন অন্য পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা। রায়গঞ্জের মাড়াইকুড়া ইন্দ্রমোহন উচ্চ বিদ্যাপীঠ কেন্দ্রের বাইরে এই মানবিক দৃশ্যে আপ্লুত শিক্ষা মহল।
গত সোমবার ছিল অঙ্ক পরীক্ষা। তার ঠিক আগেই ভোরে দীর্ঘ রোগভোগের পর একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নন্দিনীর মা রেখা বর্মন। অশ্রুসিক্ত চোখে মায়ের পায়ে প্রণাম জানিয়েই পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল ভূপাল চন্দ্র বিদ্যাপীঠের ছাত্রী নন্দিনী। পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরে জননীর মরদেহ জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেও শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে নিজ হাতে মায়ের মুখাগ্নি করে সে। মঙ্গলবার ভৌতবিজ্ঞান আর বুধবার জীবনবিজ্ঞান— শোক বুকে পাথর করে সব কটি পরীক্ষাই দিয়েছে নন্দিনী।
বুধবার সকালে নন্দিনী যখন তাঁর বাবা শ্যামল বর্মন ও জেঠিমার হাত ধরে কেন্দ্রে পৌঁছাল, তখন থেকেই গুমোট পরিবেশ ছিল মাড়াইকুড়া ইন্দ্রমোহন উচ্চ বিদ্যাপীঠ চত্বরে। নন্দিনী সহ সমস্ত পরীক্ষার্থী ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর গেটের বাইরে সমবেত হন শতাধিক অভিভাবক। তাঁরা নন্দিনীর বাবা ও জেঠিমাকে ডেকে নিয়ে এসে প্রয়াত রেখা দেবীর স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। মজিবর রহমান, কৃষ্ণা বর্মন, রাজা মহম্মদের মতো অভিভাবকেরা শোকস্তব্ধ পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
নন্দিনীর বাবা শ্যামল বর্মন বলেন, “মেয়ের ১০ রোল, ভেবেছিলাম খুব ভালো রেজাল্ট করবে। কিন্তু মায়ের মৃত্যু সব পাল্টে দিল। তবে আজ অভিভাবকদের এই সহমর্মিতা দেখে আমি অভিভূত। আগামীতেও সকলে এভাবেই পাশে থাকবেন আশা রাখি।”
অভিভাবক মজিবর রহমান জানান, “আমাদের বড় পরিচয় আমরা মানুষ। নন্দিনীর লড়াই আমাদের চোখে জল এনে দিয়েছে। ও যে সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তাকে কুর্নিশ জানাতেই এই উদ্যোগ।” দুপুর ২টোয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর স্কুলের প্রধান শিক্ষক উৎপল গোস্বামী এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক কাঞ্চিরাম রায়ও নন্দিনীর সঙ্গে দেখা করে সবরকম সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।
শোকের কালো মেঘের মাঝেও রায়গঞ্জের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল, পরীক্ষা শুধু নম্বর পাওয়ার লড়াই নয়, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক বড় প্ল্যাটফর্মও।
