সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, কানসাস সিটি: ছোট্ট অ্যালি যেন বিমানবন্দরটাকেই আস্ত ফুটবল মাঠ বানিয়ে ফেলেছে। মায়ের হাত ধরে উড়ানে ওঠার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তার ছোট্ট পায়ের কারিকুরি মুগ্ধ করল যাত্রীদের- কারণ, তাকে যে লিওনেল মেসি হতে হবে (Leonel Messi)! আটলান্টা থেকে কানসাসগামী বিমানের ভেতরেও সেই একই উন্মাদনার রেশ। পাইলট যখন স্পিকারে সহাস্যে প্রস্তাব দিলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে নিয়ে একটা গান হয়ে যাক!’, তখন চোখের পলকে গোটা বিমান গেয়ে উঠল ‘মুচাচোস’। কানসাসের মাটিতে পা রাখতেই বাসচালকের প্রশ্ন, ‘সুইসো না আর্জেন্টিনো?’ কোরাসে দৃপ্ত জবাব এল, ‘আর্জেন্টিনো!’ ফ্যান পার্ক থেকে শুরু করে শহরের রাজপথ- সবই এখন নীল-সাদা স্রোতের নিরঙ্কুশ দখলে।
কিন্তু এই প্রবল উচ্ছ্বাসের বিন্দুমাত্র আঁচ পৌঁছানোর উপায় নেই স্পোর্টিং কেসি ট্রেনিং সেন্টারে। তিন স্তরের দুর্ভেদ্য নিরাপত্তায় মোড়া মেসিদের অনুশীলন শিবির। নির্ধারিত মিটিং পয়েন্টে জোড়া তল্লাশির পর বাসে করে মাঠের ধারে নিয়ে যাওয়া, আর সেখানেও ফিফার কড়া নজরদারি। এমন নিশ্ছিদ্র প্রহরার মধ্যেও লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়া মহাদেশের অগণিত সাংবাদিক ভিড় জমিয়েছেন শুধুমাত্র একটি মানুষকে চাক্ষুষ করার তীব্র বাসনায়। কানসাসে দলের এই বেস ক্যাম্পটি কোনও বাড়াবাড়ি রকমের জৌলুসে মোড়া নয়, তবে তা দলের নিখুঁত প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো। কোচ লিওনেল স্কালোনি চিরকালই এমন। কাতার বা রাশিয়ার মতোই তিনি আড়ম্বরহীন, শান্ত পরিবেশ পছন্দ করেন। দলের এক নম্বর মহাতারকার বর্ণময় গ্ল্যামারের আড়ালে তিনি ঢাকা পড়ে থাকলেও, তিনিই আসলে গোটা দলকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখা নীরব কান্ডারি।
কোয়ার্টার ফাইনালের আগে সাংবাদিক সম্মেলনেও স্কালোনির সেই শান্ত অথচ দৃঢ় চরিত্রের প্রকাশ ঘটল। ৩৯ বছর বয়সি মেসিকে নিয়ে ওঠা সমস্ত বয়সের প্রশ্ন তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন অবলীলায়। তাঁর কথায়, যারা মনে করছিল এই বয়সে এসে মেসি আর আগের মতো খেলতে পারবেন না, তারা আসলে তাঁকে চেনেই না। স্কালোনি স্পষ্ট বলে দেন, ‘যতদিন ও চাইবে, ততদিন ও-ই সেরা থাকবে।’ ফিটনেস কোচের সঙ্গে মেসির প্রস্তুতির প্রশংসা করে তাঁর মন্তব্য, লিও প্রায় একটি মেশিন যে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয়। অস্ট্রিয়া ও মিশরের বিরুদ্ধে পেনাল্টি ফস্কালেও, স্পট কিকের দায়িত্ব থেকে মেসিকে সরানোর কথা তাঁর মাথাতেই আসেনি। দলে লিয়ান্দ্রো পারেডেস বা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ থাকলেও, স্কালোনির সাফ কথা, ‘পেনাল্টি পেলে সিদ্ধান্তটা আমি লিও-র ওপরই ছেড়ে দিয়েছি, যদি চায়, তবে ও-ই পেনাল্টি নেবে।’ মেসির স্নায়ুচাপ সামলানোর অবিশ্বাস্য ক্ষমতাই যে দলের মানসিক দৃঢ়তার অন্যতম ভিত্তি, তা কোচের কথায় স্পষ্ট।
প্রতিপক্ষ সুইৎজারল্যান্ডকে অবশ্য এতটুকুও হালকাভাবে নিচ্ছেন না তিনি। ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের শেষ আটে পৌঁছানো এবং কলম্বিয়াকে ছিটকে দেওয়া সুইসদের সম্পর্কে তাঁর সতর্কবার্তা, ‘খাতায়-কলমে কোনও সহজ প্রতিপক্ষ নেই।’ সুইসরা শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিশ্বকাপে তাদের নিজস্ব একটা ঐতিহ্য রয়েছে বলেও তিনি মনে করিয়ে দেন। অন্যদিকে, ফিফার পক্ষ থেকে রেফারিংয়ে আর্জেন্টিনাকে অন্যায্য সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছিল, তাও কড়া ভাষায় নস্যাৎ করেছেন স্কালোনি। তাঁর মতে, ভিএআর প্রযুক্তির যুগে পক্ষপাতিত্বের কোনও সুযোগ নেই, এই সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত থাকা তাঁর এই দল শুধুমাত্র জয়ের জন্য নয়, বরং এমন একটা দল হিসেবে মানুষের মনে থেকে যেতে চায়, যারা ‘কখনও হাল ছাড়ে না’।
কানসাসের রাস্তায় ঘুরলে একটা বিষয় বেশ স্পষ্ট, নীল-সাদা সমর্থকদের মনে এখন আর শুধু অহংকার নেই, আছে এক অদ্ভুত প্রার্থনা। পরপর দুটি রুদ্ধশ্বাস নকআউট ম্যাচে খাদের কিনারা থেকে ফেরার পর তাঁরা অনেকটাই সাবধানী। প্রবীণ আর্জেন্টাইন সাংবাদিক ফ্রান্সিসকো যেমন বলছিলেন, ‘কাজটা একেবারেই সহজ নয়, তবে আমাদের বিশ্বাস আছে।’ সমস্ত বিতর্ক আর সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে, সমর্থকদের এখন একটাই নিরিবিলি চাওয়া— শেষ চারের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁদের মহানায়কের বিদায়বেলাটা যেন চূড়ান্ত সম্মানের হয়।

