লাটাগুড়ি: পুরোনো লাটাগুড়ির সঙ্গে এখনকার লাটাগুড়িকে মেলানো দায়। এলাকায় যেভাবে একের পর এক রিসর্টের বাড়বাড়ন্ত তাতে এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক। তাই গরুমারা জাতীয় উদ্যানের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় লাটাগুড়িতে (Lataguri Tourism Disaster) নতুন করে আর কোনও রিসর্ট গড়ার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। গরুমারার পাশে লাগামহীনভাবে রিসর্ট গড়ে উঠলে ভবিষ্যৎ চরম ভয়াবহ হতে পারে। লাটাগুড়িতে আয়োজিত বিশেষজ্ঞদের এক সম্মেলনে এমন আশঙ্কাই প্রকট হল। বর্তমানে লাটাগুড়িতে পর্যটকদের আনাগোনা ক্রমশ কমছে। এই গ্রাফ কীভাবে ফের ঊর্ধ্বমুখী করা যায়, সেই লক্ষ্যে লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটিতে গরুমারার প্রাক্তন বনাধিকারিক তাপস দাস ও বিমল দেবনাথের পাশাপাশি বিশিষ্ট পর্যটন বিশেষজ্ঞ রাজ বসুও রয়েছেন। শনিবার লাটাগুড়িতে কমিটির সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানেই উত্তরবঙ্গের পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নিজেদের সুনির্দিষ্ট মতামত তুলে ধরেন।
গরুমারাকে (Gorumara) কেন্দ্র করে লাটাগুড়িতে একের পর এক রিসর্ট গড়ে উঠেছে। এ বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে সম্মেলনে প্রাক্তন বনাধিকারিক তাপস দাস বলেন, ‘বর্তমানে সেই সংখ্যা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে অবিলম্বে ইতি টানা প্রয়োজন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত রিসর্ট পরিবেশ ও বন্যপ্রাণের ওপর যেমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, তেমনই এর একটি নেতিবাচক অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘গরুমারা জঙ্গলে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি পর্যটককে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার নিয়ম নেই। ফলে অতিরিক্ত পর্যটক লাটাগুড়িতে এলে তাঁদের অনেকেই জঙ্গলে ঢোকার সুযোগ পাবেন না। এতে একদিকে যেমন বনের ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে সুযোগ না পেয়ে পর্যটকদের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা যাবে।’ তঁার কথায়, ‘বর্তমানে জঙ্গলে প্রবেশের জন্য কোনও এন্ট্রি ফি নেওয়া হয় না। দীর্ঘমেয়াদে এটি একেবারেই যুক্তিসংগত নয়। পর্যটকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হলে সেই অর্থ জঙ্গলের উন্নয়ন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিকাঠামো গড়ার কাজে লাগানো সম্ভব।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে গরুমারার আরেক প্রাক্তন বনাধিকারিক বিমল দেবনাথ জানান, গত দেড় দশকে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে লাটাগুড়ির পর্যটন ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে রাজ্য সরকারের কাছে ইকো সেনসিটিভ জোনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে গরুমারা এবং আশপাশের বেশ কিছু এলাকা নিয়ে ইকো সেনসিটিভ জোন গঠনের প্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইকো সেনসিটিভ জোনকে সামনে রেখে সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো অত্যন্ত প্রয়োজন।’ বিমলের আক্ষেপ, ‘একসময় গরুমারাকে কেন্দ্র করে আদিবাসী নৃত্য, হস্তশিল্প এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের কর্মসংস্থান হত। বর্তমানে সেই কর্মকাণ্ড অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’ লাটাগুড়ির পর্যটনশিল্পের পুনরুজ্জীবনে একটি পূর্ণাঙ্গ দাবিপত্র তৈরি করে সরকারের হাতে তুলে দিতে তিনি প্রস্তাব দেন।
বর্ষার কয়েক মাস জঙ্গল বন্ধ থাকার কারণে এলাকার পর্যটন ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে পর্যটন বিশেষজ্ঞ রাজ বসুর বক্তব্য, ‘এই বিষয়টি বিবেচনা করেই একসময় বর্ষাকালে মেদলা নজরমিনার খোলা রাখার নিয়ম চালু হয়েছিল। তবে পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ৩০৪ জন মানুষের স্বাক্ষরিত একটি দাবিপত্র ডিএফও-র মাধ্যমে রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হয়। তার ফলেই দীর্ঘ তিন বছর বন্ধ থাকার পর এবার ফের বর্ষাকালে মেদলা নজরমিনার খোলা রাখা সম্ভব হয়েছে।’ আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছর এই এলাকার পর্যটন ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে এখনই একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি তৈরি করা দরকার বলে রাজ মনে করেছেন। তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি, এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কত মানুষ জড়িয়ে আছেন, সেই তথ্য-প্রমাণও সরকারকে জানানো জরুরি।’ লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক রাজাশিস চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘উপদেষ্টা কমিটির পরামর্শ মেনে একটি সুসংহত প্রস্তাবপত্র তৈরি করা হচ্ছে। এটি শীঘ্রই রাজ্য সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।’
সভায় বার্ড ট্যুরিজম, রিভার ট্যুরিজম ও হেলথ ট্যুরিজম সহ একাধিক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সমস্ত বিষয়েও নতুন প্রস্তাবগুলিও খুব শীঘ্রই রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হবে বলে সংগঠনের সভাপতি দেবজ্যোতি রায় জানিয়েছেন।

